ইরানের প্রতি ট্রাম্পের চরমপত্র: ১০ দিনের মধ্যে চুক্তির আলটিমেটাম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মাত্র ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তেহরান ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে না নিলে দেশটিতে ভয়াবহ সামরিক হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। পেন্টাগন ও মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন সামরিক শক্তি সমাবেশ করেছে, যার ফলে চলতি সপ্তাহের শেষভাগেই যেকোনো বড় ধরনের অভিযান শুরু করা সম্ভব।

সামরিক প্রস্তুতি ও হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যস্থল

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামলার সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রকাশ না করলেও সামরিক প্রস্তুতিই তার অভিপ্রায় স্পষ্ট করে দিচ্ছে। এবারের সম্ভাব্য হামলার মূল লক্ষ্য হবে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো। গত বছরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্পের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে ইরানের পরমাণু সক্ষমতাই প্রধান অন্তরায়।

মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান মার্কিন সামরিক শক্তির রূপরেখা:

সামরিক সরঞ্জাম/বাহিনীপরিমাণ ও সক্ষমতা
বিমানবাহী রণতরি২টি পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইক গ্রুপ।
যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনডজনখানেক ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার ও পারমাণবিক সাবমেরিন।
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান৫০টিরও বেশি (এফ-৩৫, এফ-২২, এফ-১৬)।
কৌশলগত বোমারু বিমানউচ্চ সতর্কতায় রাখা বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান।
সেনা সদস্যবিভিন্ন ঘাঁটিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার প্রশিক্ষিত সেনা।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপ্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও গাজা পিস বোর্ডের বক্তব্য

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসলেও কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ‘গাজা বোর্ড অব পিস’-এর এক সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “গত বছর হামলা চালিয়ে আমরা ইরানকে কিছুটা সংযত করতে পেরেছিলাম, তবে এখন হয়তো আমাদের আরও এক ধাপ এগিয়ে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। ১০ দিনের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।” ইরানের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় দিতে নারাজ।

ইসরায়েলের তৎপরতা ও আঞ্চলিক ঝুঁকি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার এই আবহে ইসরায়েলও যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, তাদের বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং তারা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে বা স্বাধীনভাবে ইরানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামরিক উত্তেজনার ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর সতর্ক করে বলেছেন, হামলা চালালে ইরানও বসে থাকবে না; তাদের প্রতিশোধমূলক পালটা হামলা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। থাড বা প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সাময়িক সুরক্ষা দিলেও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো অসম্ভব হবে। ট্রাম্পের এই ১০ দিনের আলটিমেটাম কেবল ইরান নয়, বরং পুরো বিশ্বকেই এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।