ইরানের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত দোহা, আবুধাবি, দুবাই ও মানামায় কেবল কাচ বা কংক্রিটের দেয়ালই ভাঙছে না, বরং উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে স্থিতিশীলতার চিত্র বিশ্বকে দেখিয়েছে, তা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন দীর্ঘদিন চেষ্টা করেছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে। তবে ইরানের আক্রমণের পর এই লক্ষ্য এখন অসম্ভব মনে হচ্ছে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির আবুধাবি ক্যাম্পাসের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক মোনিকা মার্কস বলেন, “মানামা, দোহা ও দুবাইয়ে বোমাবর্ষণ হতে দেখা ঠিক ততটাই অদ্ভুত, যত মার্কিনদের জন্য শার্লট, সিয়াটল বা মায়ামিতে বোমা বর্ষণ হওয়া।”
গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক নেতাকে হত্যা করেছে। এর জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া, কাতারে ১৬ জন, ওমানে ৫ জন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে ৪ জন আহত হয়েছেন।
কাশ্মির, দুবাই ও মানামার বহু ভবনে আঘাত লেগেছে। দোহায় কিছু এলাকায় ধোঁয়া দেখা গেছে। সৌদি আরবও জানিয়েছে, তাদের রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধ চাইনি। হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে ওমানের উদ্যোগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল–বুসাইদি বলেছিলেন, শান্তি ‘হাতের নাগালে’, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন অতি সংবেদনশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি। তাদের সবচেয়ে দুর্বল অবকাঠামো হলো বিদ্যুৎ গ্রিড, পানীয় জল পরিশোধন প্ল্যান্ট এবং জ্বালানি অবকাঠামো। এসব অবকাঠামোর ওপর আঘাত দেশগুলোর জন্য দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি তৈরি করবে।
কিংস কলেজ লন্ডনের লেকচারার রব গাইস্ট পিনফোল্ড বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে এখন আমরা একটি নতুন মডেল দেখতে পাচ্ছি — রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধ। পূর্বে যা প্রক্সি যুদ্ধ বা ধূসর সংঘাত হিসেবে দেখা যেত, এখন তা সরাসরি রাষ্ট্রগুলোকে জড়িত করে।”
নিচের টেবিলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রাথমিক তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| দেশ / শহর | নিহত | আহত | ক্ষতির ধরন |
|---|---|---|---|
| আরব আমিরাত | ৩ | ৫৮ | ভবন ও বিমানবন্দর আঘাতপ্রাপ্ত |
| কাতার | ০ | ১৬ | ভবন ক্ষতি, ধোঁয়া দেখা গেছে |
| বাহরাইন | ০ | ৪ | বহুতল ভবনে আঘাত |
| ওমান | ০ | ৫ | সীমিত আঘাত |
| কুয়েত | ০ | ৩২ | বিমানবন্দরে ক্ষতি |
| সৌদি আরব (রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চল) | ০ | অজানা | শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত |
উপসংহারে, উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত কৌশল পুনঃসমন্বয় করছে। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে ইরান কী করবে। এখনও পর্যন্ত তারা চেষ্টা করছে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবেন না, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের সঙ্গে শহরের ক্ষতি বেড়ে যাওয়ায় এই বিকল্প দ্রুত হাতছাড়া হতে পারে।
