ইভ্যালীর গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন 

বিশেষ প্রতিনিধি; জিলাইভ২৪.কম

বহুল আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বা অনলাইন মার্কেটপ্লেস ইভ্যালী’র গ্রাহকদের আটকে থাকা টাকা ফেরত দেয়া শুরু হয়েছে।

চলতি ফেব্রুয়ারী মাসের ১২ তারিখ থেকে শুরু করে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ১৪ গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে বলে বানিজ্য মন্ত্রনালয় সুত্র জানিয়েছে।
পেমেন্ট গেটওয়ে তে গ্রাহকদের আটকে থাকা মোট ২৫ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে ফেরত দেয়া হবে।
যেসব গ্রাহকের টাকা আটকে আছে তারা যে যে মাধ্যমে কাঙ্খিত পন্যের অর্ডার করে টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন ঠিক সেই মাধ্যমে আবার টাকা ফেরত পাবেন।
এর মানে হলো মোবাইল ব্যাংকি বা অন্য কোনও মাধ্যম যেমন ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড এ টাকা ট্রান্সফার করা হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অনুকূলে একই মাধ্যমে টাকা ফেরত যাবে। এজন্য গ্রাহককে কারো সাথে কোনও যোগাযোগ বা তদবীর করতে হবে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেল-এর দায়িত্বে থাকা উপসচিব মুহাম্মদ সাঈদ আলী জিলাইভ২৪.কম কে বলেন, এ পর্যন্ত ১৪ গ্রাহকের এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৭ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, গ্রাহকদের মোট ২৫ কোটি টাকা আটকা আছে পেমেন্ট গেটওয়েতে। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এমএফএস নগদে, ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিকাশে এবং ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা এসএসএল-এ জমা আছে।
এসএসএল বা সিকিওর সকেটস লেয়ার হলো ওয়েবসাইটে ক্রেতার তথ্য সুরক্ষিত রাখার একটি স্তর। এটি অনলাইন কেনাবেচায় পেমেন্ট গেটওয়ে-তে ব্যবহার হয়।
সাঈদ আলী জানান, আদলত কতৃক গঠিত ইভ্যালির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের অনাপত্তির ভিত্তিতে এই টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গেটওয়ে-তে জমা থাকা পুরো টাকা সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে ফেরত দেয়া হবে।

ইভ্যালীর ইতিহাস

অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইভ্যালীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস এ কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫ লাখ টাকা।
গাড়ি, মোটরসাইকেল, গৃহস্থালির আসবাবপত্র, স্মার্ট টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিনসহ নানারকম পণ্য অর্ধেক দামে বা নগদ ডিসকাউন্ট এ বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্প সময়ে গ্রাহকদের নজরে আসে ইভ্যালি।
চমকপ্রদ সব ‘অফারের’ প্রলোভনে অনেকেই বিপুল অংকের টাকা অগ্রিম দিয়ে পণ্যের অর্ডার করেছিলেন।
কিন্তু তাদের অনেকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও পণ্য বুঝে পাননি। ইভ্যালি অগ্রিম হিসেবে নেওয়া টাকাও ফেরত দেয়নি।
প্রলোভনে পড়ে ব্যাংক ঋণ, ধার-দেনা করে, জমি বা গয়না বেচে সেই টাকা ইভ্যালিতে লগ্নি করে বিপদে পড়েন বহু গ্রাহক।
ফরহাদ হোসেন নামের এক গ্রাহক ৩৩ হাজার ৩০৮ টাকা পরিশোধ করেও পণ্য না পেয়ে  ইভ্যালির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান।
সে আবেদনেই ইভ্যালির অবসায়ন প্রশ্নে নোটিস জারির পাশাপাশি কোম্পানিটির সম্পদ বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেয় হাই কোর্ট।
এরই ধারাবাহিকতায় ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী কোম্পানির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে প্রতারণার ঐ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। শামীমা নাসরিন জামিনে মুক্তি পেলেও রাসেল এখনো কারাগারে আছেন।
এরপর গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ইভ্যালীর সম্পদ নিরুপন ও কোম্পানী পরিচালনা এবং গ্রাহকের টাকা ফেরতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে হাই কোর্ট একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেয়।
google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

ইভ্যালীর মোট দায়

নতুন পরওচালনা পর্ষদ গঠনের আগে ইভ্যালির কর্মকর্তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানায় শুধু গ্রাহকদের কাছে তাদের দেনার পরিমাণ ৩১১ কোটি টাকা। আর এই দেনা আছে মোট ২ লাখ ৭ হাজার ৭৪১ গ্রাহকের বিপরীতে। তিন দফায় তাগাদার পর ইভ্যালী গ্রাহকদের কাছে দেনার পরিমাণ ও গ্রাহকসংখ্যা জানায়।

ইভ্যালীর যত সম্পদ

ইভ্যালির হিসাব অনুযায়ী, দায়ের বিপরীতে সম্পদ রয়েছে ৯০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর সম্পত্তি, স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি মিলিয়ে রয়েছে ১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। মোট ১০৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার এ দুটির যোগফলকে দেখানো হচ্ছে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে।

ইভ্যালীর ৭ বিলাসী গাড়ী নিলামে বিক্রি

আদালত কতৃক গঠিত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর ঢাকার বাড়িধারার ‘জে’ ব্লকে ১১ নম্বর রোডে নির্মাণাধীন বাড়িতে রাখা ইভ্যালীর ৭ গাড়ী নিলামে বিক্রি হয়।
নিলামের তালিকায় ছিল একটি রেঞ্জ রোভার, একটি টয়োটা প্রায়াস, একটি টয়োটা সিএইচআর, দুটি টয়োটা এক্সিও, একটি হোন্ডা ভেজেল ও একটি টয়োটা মাইক্রোবাস।
এসব গাড়ির মোট ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। নিলামে ২ কোটি ৯০ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এসব গাড়ী।

ইভ্যালীর পর্ষদে শামীমা নাসরিনের ফিরে আসা

ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের পরিবারের সদস্যদের পরিচালনায় এখন চলছে ইভ্যালি।
২০২২ সালের ২৪ আগস্ট বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ ইভ্যালীর পর্ষদে শামীমা নাসরিন এবং তার মা ও ভগ্নিপতিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আদেশ দেন। এরপরই বিচারপতি মানিকের নেতৃত্বে গঠন করে দেওয়া ৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ পদত্যাগ করে।
অতপর: সাবেক চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের নেতৃত্বে চলে আসে ইভ্যালী। পর্ষদে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন তার মা ফরিদা আক্তার ও ভগ্নিপতি মামুনুর রশীদ। এ ছাড়া আছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী কামরুন নাহার ও ই–কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইক্যাব) সহসভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন।

ইভ্যালীর প্রতারনার প্রেক্ষাপটে নতুন নীতিমালা

সরকার ইভ্যালীর এ প্রতারনার প্রেক্ষাপটে নতুন নীতিমালা করে  গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করেছে।
২৭-০২-২০২৩ ইং। সময় ২০:৪০ মিনিট।

Leave a Comment