কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। নিজ দপ্তরে নৃশংসভাবে খুন হওয়া এই শিক্ষিকার স্বামী মুহা. ইমতিয়াজ সুলতান বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক এবং এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
Table of Contents
মামলার প্রেক্ষাপট ও আসামিদের পরিচয়
বুধবার দিবাগত রাতে দায়ের করা এই মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে সমাজকল্যাণ বিভাগেরই সাবেক কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমানকে, যাকে ঘটনার পর ওই কক্ষ থেকেই রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসমা সাদিয়া বিভাগের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চাওয়ায় এবং দুর্নীতিতে বাধা দেওয়ায় সহকর্মীদের চক্ষুশূলে পরিণত হন।
মামলার প্রধান চার আসামির তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| নাম ও পদবী | মামলায় ভূমিকা | বর্তমান অবস্থা |
| খন্দকার ফজলুর রহমান (কর্মচারী) | সরাসরি ঘাতক | চিকিৎসাধীন ও পুলিশি হেফাজতে |
| শ্যাম সুন্দর সরকার (সহকারী অধ্যাপক) | মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা | পলাতক/তদন্তাধীন |
| হাবিবুর রহমান (সহকারী অধ্যাপক) | পরিকল্পনা ও প্ররোচনা | তদন্তাধীন |
| বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস (সহকারী রেজিস্ট্রার) | পরিকল্পনা ও আর্থিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত | তদন্তাধীন |
কেন এই হত্যাকাণ্ড? (বাদীর অভিযোগ)
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসমা সাদিয়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সাবেক সভাপতি শ্যাম সুন্দর সরকার বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব বুঝিয়ে না দেওয়ায় এবং সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমারের অবৈধ আর্থিক আবদারে সায় না দেওয়ায় দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। কর্মচারী ফজলুর রহমান সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতেন এবং আসমাকে হেনস্তা করতেন। বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ডিনের নির্দেশে ফজলুর ও বিশ্বজিৎকে বদলি করা হলে শিক্ষক হাবিবুর রহমান আসমাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। এই ক্ষোভ থেকেই দুই শিক্ষক ও কর্মকর্তার নির্দেশে ফজলুর রহমান আসমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেন বলে বাদী দাবি করেছেন।
ময়নাতদন্তের ভয়াবহ চিত্র
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত ময়নাতদন্তে আসমার শরীরে ২০টিরও বেশি গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গলার নিচে সজোরে করা ঘাতক আঘাতটিই তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর হাতেও জখম হয়েছে, যা থেকে প্রমাণিত হয় তিনি বাঁচার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধস্তাধস্তি করেছিলেন।
ফজলুরের জবানবন্দি ও অভিযুক্তদের বক্তব্য
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঘাতক ফজলুর রহমান পুলিশকে লিখে জানিয়েছেন যে, দীর্ঘ ৮-৯ বছর এক বিভাগে থাকার পর তাঁকে বদলি করা এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তিনি জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। এই তীব্র ক্ষোভ থেকেই তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন। তবে অভিযুক্ত শিক্ষক শ্যাম সুন্দর ও হাবিবুর রহমান তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাবিবুর রহমান এমনকি আসমার জানাজায় উপস্থিত থেকে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা ও বিচার দাবি
শিক্ষিকা হত্যার খবরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা খুনি ফজলুরসহ নেপথ্যের কুশীলবদের প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। তাঁদের উত্থাপিত ৯ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ক্যাম্পাস ও বিভাগে সিসি ক্যামেরা স্থাপন।
স্মার্ট আইডি কার্ড ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
বিভাগীয় আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখা।
বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজের পর কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে আসমা সাদিয়াকে দাফন করা হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর মাত্র ছয় মাসের শিশুকে রেখে বিভাগের দায়িত্ব নেওয়া এই মেধাবী শিক্ষিকার এমন করুণ মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
