দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও ভৌগোলিক সংমিশ্রণে আসাম ও বাংলার সম্পর্ক কোনো সাম্প্রতিক বা ঔপনিবেশিক কৃত্রিম সীমানানির্দেশক প্রপঞ্চ নয়; বরং তা উত্তর-পূর্ব ভারতের উর্বর নদী অববাহিকায় আড়াই হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এক অখণ্ড সভ্যতা ও জনমিতিক প্রবাহের ইতিহাস। প্রাচ্য ভারতের প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা-বরাক নদীর প্লাবনভূমি যৌথভাবে বাঙালি ও অসমীয়া জাতির আদি জনপদের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসামের বুকে বাঙালির উপস্থিতি নিছক পরিযায়ী জনগোষ্ঠীর অভিবাসন নয়; এটি প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুর ও কামরূপের সামাজিক বিস্তার, ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন, ভাষা আন্দোলন এবং দেশভাগ-পরবর্তী নাগরিকত্ব সংকটের এক জটিল ও বহুমুখী ঐতিহাসিক মহাকাব্য।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপটে কামরূপ এবং গৌড়-বঙ্গ রাজ্যের সীমান্ত ছিল নিয়ত পরিবর্তনশীল ও প্রবাহমান। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং তৎসংলগ্ন বরাক উপত্যকায় প্রাচীনকাল থেকেই ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠী ও সংস্কৃতিচর্চার যে বিকাশ ঘটেছিল, তা গৌড়ীয় ও কামরূপী প্রাক-উৎসের যৌথ ফসল। প্রাক-মধ্যযুগে চর্যপদের যুগ থেকে শুরু করে কামরূপী প্রাকৃত ভাষার বিকাশপর্যায়ে বাংলা ও অসমীয়া ভাষার ঐতিহাসিক সীমানা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সহাবস্থানমূলক। মধ্যযুগে কোচবিহারের কোচ রাজাদের (যেমন মহারাজা নরনারায়ণ ও বীর চিলারায়) রাজত্বকালে এবং পরবর্তীতে আহোম রাজাদের শাসনামলে আসামে প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে বাংলা অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক পন্ডিত, কারিকুর, লিপিকার ও বৈষ্ণব ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানিয়ে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করানো হয়। বিশেষ করে শ্রীচৈতন্যদেবের অনুগামী গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের প্রবাহ যখন কামরূপ ও দারাং অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে, তখন থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির এক প্রজ্ঞাময় সমন্বয় গড়ে উঠেছিল।
বাঙালি ও অসমীয়া সম্পর্কের রাজনৈতিক ও জনমিতিক মোড় ঘুরে যায় ১৮২৬ সালের ঐতিহাসিক ইয়ান্দাবু চুক্তির (Treaty of Yandabo) মাধ্যমে, যার মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসামকে নিজেদের উপনিবেশভুক্ত করে এবং বাংলা প্রেসিডেন্সির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। ঔপনিবেশিক শাসনের সুপ্রশাসন ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে ১৮৩৬ সালে ইংরেজরা তৎকালীন স্থানীয় অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলাকে আসামের আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর পর ১৮৭৩ সালে অসমীয়া ভাষা তার সরকারি মর্যাদা ফিরে পেলেও, এই সংক্ষিপ্ত ঔপনিবেশিক সিদ্ধান্ত দুই প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মনস্তত্ত্বে এক গভীর সামাজিক দূরত্বের বীজ বপন করে দেয়। এর পাশাপাশি ১৮৭৪ সালে আসামকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করে যখন ‘চিফ কমিশনার্স প্রভিন্স অব আসাম’ গঠন করা হলো, তখন প্রশাসনিক রাজস্ব ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে বৃহৎ বাংলাভাষী অঞ্চল শ্রীহট্ট (সিলেট) জেলাকে অখণ্ড আসামের সাথে যুক্ত করা হয়। এর ফলে প্রশাসনিকভাবে আসামের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ রাতারাতি বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ঔপনিবেশিক আমলের দ্বিতীয়ার্ধে আসামের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশরা তাদের চা-বাগানের বিস্তৃতি, বনভূমি উদ্ধার এবং পড়ে থাকা উর্বর জমি থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে দুই ধরনের বঙ্গীয় জনগোষ্ঠীর আগমনকে ত্বরান্বিত করে। একদিকে ছোটনাগপুর ও শান্তাল পরগনা থেকে বাংলাভাষী সাঁওতাল ও মুন্ডা চা-শ্রমিকদের আসামের উজান অঞ্চলে আনা হয়; অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ, পাবনা, রংপুর ও ঢাকা থেকে লাখ লাখ ভূমিহীন মুসলিম কৃষককে ব্রহ্মপ্রদেশের ‘চর’ ও ভাটি অঞ্চলে ধান ও পাট চাষের জন্য উৎসাহিত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯২০-এর দশকে তৎকালীন আসাম প্রাদেশিক সরকারের সময় প্রবর্তিত ‘লাইন সিস্টেম’ (Line System) বা ভূমিসীমানা নীতি স্থানীয় অসমীয়া ও বহিরাগত বাঙালি কৃষকদের মধ্যে ভৌগোলিক বিভাজন তৈরি করলেও, আসামের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এই কঠোর পরিশ্রমী কৃষকশ্রেণী এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক দেশভাগ এবং ১৯৪৭ সালের ঐতিহ্যবাহী সিলেট গণভোট (Sylhet Referendum) আসামের বাঙালিদের অস্তিত্বের সমীকরণকে এক কঠিন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। গণভোটের ফলে সিলেটের সিংহভাগ অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হলেও, সাড়ে তিনটি থানা (করিমগঞ্জ মহকুমা) অখণ্ড আসামের বরাক উপত্যকার অংশ হিসেবে থেকে যায়। এর সাথে সাথে দেশভাগের নির্মম রক্তাক্ত বাস্তবতা ও ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হয়ে লাখ লাখ পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু শরণার্থী আসামের গোহাটি, তেজপুর, ধুবড়ি, শিলচর ও করিমগঞ্জে আশ্রয় নেন। এই বিরাট সংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আগমন আসামের ভূ-রাজনৈতিক ও ভাষাগত জনমিতিকে পুনরায় আন্দোলিত করে তোলে, যার জের ধরে স্বাধীনোত্তর আসামে শুরু হয় তীব্র জাতিগত ও ভাষাগত স্বাধিকার আন্দোলন।
স্বাধীন ভারতের আসামে বাঙালিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও প্রজ্ঞাময় অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬১ সালের ১৯ মে, বরাক উপত্যকার ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। ১৯৬০ সালে আসাম বিধানসভায় অসমীয়া ভাষাকে সমগ্র রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করা হলে, বরাক উপত্যকার বাঙালি সমাজ নিজেদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯ মে ১৯৬১ সালে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে তৎকালীন প্রাদেশিক পুলিশের গুলিতে কমলা ভট্টাচার্য (যিনি বিশ্বসাহিত্যের প্রথম নারী ভাষাশহীদ), কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাসসহ মোট ১১ জন বাঙালি তরুণ-তরুণী প্রাণ বিসর্জন দেন। এই মহান আত্মত্যাগের কাছে নতিস্বীকার করে পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের আসাম ভাষা আইন সংশোধন করা হয় এবং বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
পরবর্তী চার দশকে আসামে বাঙালিদের পরিচয়, সামাজিক স্থায়িত্ব ও নাগরিকত্ব এক নতুন প্রশাসনিক রাজনীতির মুখে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে শুরু হওয়া অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলোর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘আসাম আন্দোলন’ (১৯৭৯-১৯৮৫) মূলত তথাকথিত অবৈধ বহিরাগত চিহ্নিতকরণের ডাক দিলেও, তা প্রকারান্তরে বিশাল সংখ্যক স্থায়ী বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। ১৯৮৩ সালের নির্মম নেলী গণহত্যা (Nellie Massacre) এবং ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক ‘আসাম চুক্তি’ (Assam Accord) এই সংগ্রামের গতিপথ নির্ধারণ করে। আসাম চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতকে মূল কাট-অফ তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আইনি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে আসামের বাঙালিদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের সংকট কেবল রাজনৈতিক বাকযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপ নিয়েছে ‘ডি-ভোটার’ (Doubtful Voter), জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) সংশোধন প্রক্রিয়া এবং ডিটেনশন ক্যাম্পের মতো এক অভূতপূর্ব মানবিক ও আইনি টানাপোড়েনে। দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী, ব্রিটিশ ও স্বাধীনোত্তর ভারতের বৈধ খতিয়ানধারী লাখ লাখ বাঙালিকে নিজেদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে প্রশাসনিক কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। তবে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাবায়ুর মধ্যেও আসামের বাঙালিরা নিজেদের আত্মপরিচয় ও আঞ্চলিক সামাজিক দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকেছেন।
আসামের আধুনিক সমাজ, সাহিত্য, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাঙালিদের অবদান অসামান্য। বরাক উপত্যকা আজ আসামের বুকে এক স্বকীয় বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষক ও গবেষকরা অসমীয়া ও বাঙালি মননের মধ্যে এক আন্তঃসাংস্কৃতিক সেতু তৈরি করেছেন। একই সাথে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমীয়া ভাষা ও সমাজকে আপন করে নিয়ে নিজেদের ‘থলুয়া’ বা স্থানীয় অসমীয়া-বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তায় রূপান্তরিত করেছেন। ভূ-রাজনীতির জটিল জটাজাল সত্ত্বেও, ব্রহ্মপুত্র ও বরাকের পলিমাটিতে গড়ে ওঠা আসামের বাঙালি সমাজ নিছক পরিযায়ী সম্প্রদায় নয়; তারা এই ভূখণ্ডের নদী, মাটি, কৃষি ও স্বাধীনতার রক্তের সাথে মিশে থাকা এক চিরন্তন ও অবিচ্ছেদ্য ঐতিহাসিক শক্তি।






