আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর সম্ভাব্য নির্বাচনী জোট। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা আটটি দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন ও ব্যাপক দরকষাকষির খবর পাওয়া গেছে। যদিও জোটের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে ‘টানাপড়েনের’ বিষয়টি অস্বীকার করে একে ‘বৃহত্তর ঐক্যের প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করছেন, তবে পর্দার আড়ালে আসন বণ্টন নিয়ে দলগুলোর দাবি এখন গাণিতিক জটিলতায় রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলো একটি শক্তিশালী মোর্চা গঠনে সম্মত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে জোটের পরিধি যত বাড়ছে, আসন বণ্টনের সমীকরণ ততটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। লিয়াজোঁ কমিটির তথ্যানুযায়ী, শরিক দলগুলোর সম্মিলিত দাবির পরিমাণ জাতীয় সংসদের মোট আসন সংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিচে জোটভুক্ত দলগুলোর আসন দাবির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সমমনা দলগুলোর প্রাথমিক আসন দাবির চিত্র
| দলের নাম | দাবিকৃত আসন সংখ্যা | বর্তমান অবস্থান ও কৌশল |
| বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী | ১৮০ – ২০০ | ৩০০ আসনেই নিজস্ব প্রার্থীর প্রস্তুতি রয়েছে। |
| ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ | ১২০ | মাঠ জরিপের ভিত্তিতে বড় অংশীদারিত্ব চায়। |
| বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস | ৩০ | অন্তত ৩০টি আসনে শক্তিশালী প্রার্থীর দাবি। |
| অন্যান্য শরিক দল (৬টি) | ১০০ | বিডিপি, জাগপা ও নেজামে ইসলামসহ অন্য দল। |
| নতুন ৩টি সহযোগী দল | অতিরিক্ত দাবি | এনসিপিসহ ছোট দলগুলোর নিজস্ব প্রত্যাশা। |
| মোট সম্মিলিত দাবি | ৩৪৮টি আসন | ৩০০ আসনের বিপরীতে এই দাবি সমঝোতা সাপেক্ষ। |
জোটের লিয়াজোঁ কমিটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ৩০০ আসনে তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের মাঠ জরিপের ভিত্তিতে ১২০টি আসনের দাবি তুলেছে। খেলাফত মজলিসসহ অন্য ছয়টি শরিক দল সম্মিলিতভাবে ১০০টি আসন প্রত্যাশা করছে। সব মিলিয়ে এই দাবির পরিমাণ ৩৪৮-এ গিয়ে ঠেকেছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ এই বিষয়ে বলেন, দলগুলোর এই দাবি মূলত তাদের সর্বোচ্চ প্রত্যাশার জায়গা থেকে করা। আলোচনার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই এটিকে বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীন আহমদ জানান, আসন সমঝোতার আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। তবে বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু কারিগরি বিষয়ে আলোচনা আটকে আছে। এনসিপি-কে জোটে নেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে কেউ কেউ কিছু আসন ছাড় দিতেও রাজি আছেন। জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের আশা প্রকাশ করেন যে, অতি দ্রুতই একটি চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই জোট শেষ পর্যন্ত সফল হলে তা নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তবে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা একক প্রতীকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলগুলোর জনপ্রিয়তা ও মাঠ জরিপকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত জামায়াত কতটি আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয় এবং শরিকরা তাদের দাবি কতটা কমিয়ে আনে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই জোটের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব।
