মিসরে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট জিন আল-আবিদিন বেন আলীর পতনের মাত্র ১১ দিনের মাথায় সে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে কায়রোসহ পুরো দেশে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব মিলিয়ে লাখো মানুষ ১৮ দিন ধরে রাজপথে নেমে আসে। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি মোবারক পদত্যাগ করে ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময় মিসরের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ। এর বড় অংশই ছিল তরুণ ও কিশোর। প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ বছরের নিচে। আজ, ১৫ বছর পর, সেই শিশুরা তরুণ প্রজন্মে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মিসরের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটিতে, যার অর্ধেকেরও বেশি ২৪ বছরের কম বয়সী। বিশ্বের গড় বয়স যেখানে প্রায় ৩১ বছর, সেখানে মিসরের গড় বয়স প্রায় ২৪ বছর—অর্থাৎ দেশটি একটি স্পষ্টতই “তরুণ রাষ্ট্র”।
অর্থনৈতিক সূচকে কিছু উন্নতি হলেও বাস্তবতায় চাপ রয়ে গেছে। ২০১১ সালে বেকারত্বের হার ছিল ১২ শতাংশ, যা এখন কমে ৬.৪ শতাংশে নেমেছে। মাথাপিছু জিডিপিও বেড়ে ২ হাজার ৫৯০ ডলার থেকে ৩ হাজার ৩৩৯ ডলারে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে মিসরীয় পাউন্ডের বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এক সময় যেখানে ১ ডলারে প্রায় ৬ পাউন্ড পাওয়া যেত, এখন তা প্রায় ৪৭ পাউন্ড।
বিশেষত তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট এখনো প্রকট। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৪.৯ শতাংশ। ইকোনমিক রিসার্চ ফোরামের হিসাবে, প্রতিবছর মিসরে অন্তত ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান প্রয়োজন, অথচ গত দুই দশকে গড়ে বছরে সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৬ লাখের মতো চাকরি। বর্তমানে প্রায় ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত, যা ২০৩২ সালের মধ্যে বাড়িয়ে ৫৬ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মিসরের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পেছনে মূল চালিকাশক্তি এই তরুণ প্রজন্মই।
২০১১ সালের ১৮ দিনের আন্দোলনের প্রধান ঘটনাগুলো সংক্ষেপে নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২৫ জানুয়ারি | দেশজুড়ে বিক্ষোভের সূচনা, মোবারকের পদত্যাগের দাবি |
| ২৮ জানুয়ারি | তাহরির স্কয়ারে লাখো মানুষের সমাবেশ, মোবারকের ভাষণ |
| ১ ফেব্রুয়ারি | ট্রেন চলাচল বন্ধ, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র |
| ২ ফেব্রুয়ারি | মোবারকপন্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ |
| ১০ ফেব্রুয়ারি | মোবারকের ক্ষমতায় থাকার ঘোষণা, জনরোষ বৃদ্ধি |
| ১১ ফেব্রুয়ারি | মোবারকের পদত্যাগ ও সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর |
আরব বসন্ত শুধু মিসরেই নয়, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এসব দেশেও জনসংখ্যার বড় অংশ ছিল তরুণ। তিউনিসিয়ায় ২৪ শতাংশ, লিবিয়ায় ২৭ শতাংশ, সিরিয়ায় ২৯ শতাংশ এবং ইয়েমেনে ৪১ শতাংশ মানুষ ছিল ১৫ বছরের নিচে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা, ক্ষোভ ও পরিবর্তনের দাবি মিলিয়েই আরব বসন্ত এক ঐতিহাসিক মোড় সৃষ্টি করেছিল, যার অভিঘাত আজও মিসরের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
