হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা মার্লন ব্র্যান্ডো একবার বলেছিলেন, তুলনার অর্থই বা কী—সবাই নিজের জায়গা থেকে সেরাটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর এই দর্শন শুধু অভিনয়ের জগতেই নয়, খেলাধুলার ক্ষেত্রেও দারুণভাবে প্রযোজ্য। তবু বাস্তবতা হলো, মানুষ তুলনা করতে ভালোবাসে। ফুটবলের মতো প্রতিযোগিতামূলক ও সৃষ্টিশীল খেলায় এই তুলনা আরও তীব্র। ঠিক তেমনই এক তুলনার জন্ম দিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ পরিবর্তনের পরের দৃশ্যপট—আলভারো আরবেলোয়ার শুরু কি জাবি আলোনসোর চেয়ে ভালো?
জাবি আলোনসোর অধ্যায়টি খুব দীর্ঘ না হলেও ছিল আলোচনায় ভরা। মাত্র সাত মাস দায়িত্বে থাকার পর ১২ জানুয়ারি তাঁকে রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে ৩–২ গোলে হার ছিল তাঁর বিদায়ের তাৎক্ষণিক কারণ। আলোনসোর অধীনে রিয়াল সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৪টি ম্যাচ খেলেছিল, যার মধ্যে ২৪টিতে জয়, ৪টিতে ড্র ও ৬টিতে হার। গোলসংখ্যা ছিল ৭২, অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড় ২.১১ গোল—মন্দ নয়, তবে রিয়ালের মানদণ্ডে পুরোপুরি সন্তোষজনকও বলা যায় না।
আলোনসোর বিদায়ের পর দায়িত্ব পান ক্লাবেরই সাবেক ডানপ্রান্তের ডিফেন্ডার আলভারো আরবেলোয়া। ২০১৭ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০২০ সাল থেকে কোচিংয়ে যুক্ত হন তিনি। দীর্ঘদিন রিয়ালের যুব একাডেমিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে গত বছর জুনে ‘বি’ দল কাস্তিয়ার কোচ হন আরবেলোয়া। সেখান থেকেই তাঁকে মূল দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আরবেলোয়ার শুরুটা অবশ্য পুরোপুরি রূপকথার মতো হয়নি। কোপা দেল রের শেষ ষোলোয় আলবাসেতের কাছে ৩–২ গোলে হেরে তাঁর যাত্রা শুরু হয় হতাশা দিয়ে। তবে সেই ধাক্কা সামলে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায় রিয়াল। পরের তিন ম্যাচে টানা জয়—লা লিগায় লেভান্তে ও ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ২–০ করে জয়, আর চ্যাম্পিয়নস লিগে মোনাকোর বিপক্ষে বিধ্বংসী ৬–১ গোলের জয়—সমর্থকদের নতুন করে আশাবাদী করে তোলে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে শুরুতেই কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। আরবেলোয়ার প্রথম চার ম্যাচে রিয়াল করেছে ১২ গোল, যেখানে আলোনসোর প্রথম চার ম্যাচে গোল ছিল ৮টি। যদিও রক্ষণে আরবেলোয়ার দল কিছুটা বেশি গোল হজম করেছে। তবু আক্রমণাত্মক ফুটবল, বল দখল এবং পাসিং—সব মিলিয়ে নতুন কোচের ছাপ স্পষ্ট।
নিচের ছকে আলোনসো ও আরবেলোয়ার শুরুর দিকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলনা করে দেখানো হলো:
| সূচক | জাবি আলোনসো | আলভারো আরবেলোয়া |
|---|---|---|
| প্রথম ৪ ম্যাচে গোল | ৮ | ১২ |
| ম্যাচপ্রতি গোলগড় | ২.১১ (৩৪ ম্যাচ) | ৩.০০ (৪ ম্যাচ) |
| ম্যাচপ্রতি শট (পোস্টে) | ১৮.৮ | ২১.৫ |
| বল দখল (গড়) | ৫৭.৩% | ৬৩.৯% |
| ম্যাচপ্রতি পাস | ৫৫৩ | ৬১৮ |
| সফল পাস | ৪৯০ | ৫৫৫ |
| প্রতিপক্ষের শট হজম | ৪.৩ | ৩.০ |
এই সংখ্যাগুলো ইঙ্গিত দেয়, আরবেলোয়ার রিয়াল তুলনামূলকভাবে বেশি নিয়ন্ত্রিত ও পাসনির্ভর ফুটবল খেলছে। প্রতিপক্ষের অর্ধে উপস্থিতি, আক্রমণের ধার এবং বলের ওপর কর্তৃত্ব—সবকিছুতেই তাঁর দল কিছুটা এগিয়ে। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে ১৪টি শট নেওয়ার বিপরীতে মাত্র ৮টি শট হজম করা কিংবা মোনাকোর বিপক্ষে মৌসুমের সবচেয়ে বড় জয়—এসবই সেই উন্নতির উদাহরণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্কোয়াডে বড় কোনো পরিবর্তন না এনেই এই উন্নতি দেখা যাচ্ছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, আরদা গুলের, কামাভিঙ্গা কিংবা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো খেলোয়াড়দের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন আরবেলোয়া। তবু মনে রাখতে হবে, এটি কেবল শুরু। আলোনসো যেমন পর্যাপ্ত সময় পাননি, তেমনি আরবেলোয়ার কাজও এখনো বিচারাধীন।
শেষ পর্যন্ত হয়তো মার্লন ব্র্যান্ডোর কথাই সত্য—কে ভালো, কে সেরা, তা নিয়ে তর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের কাজটা সৎভাবে করা। আলোনসো ও আরবেলোয়া—দুজনই সেই কাজটাই করেছেন, নিজেদের মতো করে।
