বাংলাদেশের আঙ্গিনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় উগ্রবাদের নতুন ঢেউ আঘাত হানছে—এমন পর্যবেক্ষণ বহুদিন ধরেই উঠে আসছিল। তবে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এবং তাঁর অনুরাগীদের ওপর প্রকাশ্য হামলার ঘটনায় সেই উদ্বেগ আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও আধ্যাত্মিকতার ধারক বাউলরা যে আজ নিপীড়নের কেন্দ্রে—যৌথ বিবৃতিতে তা তুলে ধরেছেন দেশের ২৫৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
বিবৃতিতে তারা তুলে ধরেন, জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা জাগিয়েছিল—পরবর্তী বাস্তবতায় তা উল্টো রূপ ধারণ করছে। সমাজজুড়ে উগ্রবাদী চক্র নিজেদের ‘ধর্মরক্ষার একমাত্র বাহক’ হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। মাজার ধ্বংস, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মানুষকে ‘কাফের’ ঘোষণা, এমনকি কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা—এসবকে তাঁরা সামাজিক উন্মত্ততার বিপজ্জনক সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এই উগ্রতার অন্যতম শিকার হয়ে উঠছে বাউল–ফকির, যারা বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য আধ্যাত্মিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। বাউলদের জটাধারা কেটে দেওয়া, পথেঘাটে হেনস্তা, অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করা—এসব ঘটনা শুধু সাংস্কৃতিক আক্রমণ নয়, বরং জনগণের জীবনযাপনের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত। নাগরিকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা বা ‘চাপের গ্রুপ’ ইত্যাদি ভাষায় ঘটনাকে হালকাভাবে উপস্থাপনের ফলে উগ্রবাদীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
তারা মনে করেন, সরকার রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার কৌশলের অংশ হিসেবেই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে; ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টাও জোরদার হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নাগরিকরা সকল বাউল শিল্পীর নিরাপত্তা, হামলার তদন্ত এবং আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তির দৃঢ় দাবি জানিয়েছেন। সমাজের নানা ক্ষেত্রের মানুষের এই স্বাক্ষর ঘোষণা করে যে, সাংস্কৃতিক বহুত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার লড়াই আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি।
