আট আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ কর্মসূচি

বিএনপি ঘোষিত প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকার পর সারাদেশে দলটির ভেতরকার অসন্তোষ স্পষ্ট আকারে দেখা দিতে শুরু করেছে। গতকাল অন্তত আটটি আসনে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মশালমিছিল থেকে শুরু করে এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ পর্যন্ত নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবাদগুলো শুধু প্রার্থী–সংক্রান্ত অসন্তোষ নয়, বরং দলীয় অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো ও মাঠ–রাজনীতির বাস্তবতা নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

৩ নভেম্বর প্রকাশিত ২৩৭ আসনের তালিকা প্রকাশের পরপরই স্থানীয় নেতা–কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। অনেকেই অভিযোগ করেন, তৃণমূলের মতামত ও জনপ্রিয়তা বিবেচনা না করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে কোথাও মনোনীত প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান, কোথাও বিকল্প প্রার্থী দাবি, আবার কোথাও প্রার্থী ঘোষণা না হওয়ায় উদ্বেগ—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

সবচেয়ে নজরকাড়া দৃশ্য ছিল চট্টগ্রাম–৪ আসনে। সেখানে ৪০ কিলোমিটারজুড়ে মানববন্ধন—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। সীতাকুণ্ড থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত মহাসড়কের এক পাশে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ প্রার্থিতা পরিবর্তনের দাবি জানান। এই বিশাল কর্মসূচি দেখায়, স্থানীয়ভাবে কোন প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতা কতটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এদিকে ঢাকা–১৪ আসনে সন্ধ্যার মশালমিছিল উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। মনোনয়ন পাওয়া সানজিদা ইসলামের বিরুদ্ধে একাংশের অসন্তোষ ধর্মীয় অভিযোগ পর্যন্ত গড়ায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। মিছিলকারীরা এস এ সিদ্দিককে প্রার্থী করার দাবি জোরালো করেন।

মুন্সিগঞ্জ–১-এ পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়। প্রার্থী পুনর্বিবেচনার দাবিতে কর্মীরা শ্রীনগর এলাকায় ঢাকা–মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করলে ঘণ্টাব্যাপী যানবাহনের চলাচল বিঘ্নিত হয়। পরে দলীয় কেন্দ্রীয় একজন নেতা এসে অবরোধকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে গণপরিবহনের চাপ কিছুটা কমান।

রাজশাহী–৩-এর বিক্ষোভ ছিল ভিন্নধর্মী—এখানে কর্মীরা মহাসড়কে শুয়ে প্রতিবাদ জানান। তাঁদের দাবি, রাজশাহী–২ অঞ্চলের ভোটারকে এনে স্থানীয় প্রার্থীর জায়গায় মনোনয়ন দেওয়া তৃণমূল রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা।

গাইবান্ধা–১-এ ‘ঢাকায় থাকা’ প্রার্থীকে বাদ দিয়ে মাঠে সক্রিয় ব্যবসায়ী আরেফিন আজিজকে প্রার্থী করার দাবি জোরদার হয়। মেহেরপুর–২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৪-এও স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় বলে পরিচিত নেতাদের পক্ষে মানববন্ধন গড়ে ওঠে।

সবশেষে কিশোরগঞ্জ–৫-এ প্রার্থী না ঘোষণার কারণে উদ্বেগে মানববন্ধন ছড়িয়ে পড়ে; দাবি একটাই—দলের প্রার্থী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকেই ঘোষণা করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিবাদ বিএনপির সাংগঠনিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যকে সামনে এনে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে এমন টানাপোড়েন সমাধান করতে না পারলে দলীয় ঐক্য ও মাঠপর্যায়ের সংগঠন উভয়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।