‘আজ যে শিশু’ থেকে ‘ঘুমভাঙা শহর’: জঙ্গীর সত্তর বছরের সংগীতযাত্রা

ধানমন্ডির রাশান হাউসের সামনে শুক্রবার সন্ধ্যায় ছিল ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিক জমায়েত। গাড়ি থামতেই একে একে নামলেন নকীব খান, সামিনা চৌধুরী, রফিকুল আলম, কবির বকুল, মেহরীনসহ বিভিন্ন প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তরুণ শিল্পীরাও। সেলফি, কুশল বিনিময় আর স্মৃতির গল্পে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। উপলক্ষ ছিল গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর ৭০তম জন্মবার্ষিকী এবং তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতিচারণা গ্রন্থ ‘আপন আলোয় শহীদ মাহমুদ জঙ্গী: গানে গানে সত্তর’–এর মোড়ক উন্মোচন।

বই প্রকাশের অনুষ্ঠান হলেও আয়োজনটি ছিল শুধুই বইকেন্দ্রিক নয়। গান, আড্ডা, স্মৃতিচারণা—সব মিলিয়ে তা পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায়। শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর লেখা গান যেমন শোনা গেল, তেমনি উঠে এলো তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের গল্প, ঢাকা–চট্টগ্রামের শিল্পী আড্ডা আর ব্যান্ড সংগীতের উত্থান–পতনের স্মৃতি।

গান দিয়ে শুরু, গানে গাঁথা স্মৃতি

আজব কারখানার আয়োজনে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় অনুষ্ঠান শুরু হয় শিশুদের কণ্ঠে ‘আজ যে শিশু’ গান দিয়ে। লার্ন গিটার উইথ আসাদ–এর শিশুশিল্পীদের পরিবেশনায় গানটি যেন নতুন করে ফিরিয়ে আনে শহরের ফুটপাত, স্টেশন আর শীতের রাতের বাস্তবতা। প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে সোলস ব্যান্ডের ‘একদিন ঘুমভাঙা শহরে’ গানে—যা বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

স্মৃতিচারণায় জঙ্গী

বইয়ের মোড়ক উন্মোচন পর্বে মঞ্চে ওঠেন নকীব খান, পিলু খান, ফয়সাল সিদ্দিকী বগি, রফিকুল আলম, সামিনা চৌধুরী, নাসিম আলী খানসহ সংগীতজগতের অনেক পরিচিত মুখ। রফিকুল আলম বলেন, শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর সঙ্গে কাজ করতে না পারার এক দীর্ঘ আক্ষেপ ছিল তাঁর। পরে সেই সুযোগ পাওয়াকে তিনি নিজের সংগীতজীবনের পূর্ণতা হিসেবে দেখেন। সামিনা চৌধুরী বলেন, নেপথ্যের মানুষদের সম্মান জানাতে এমন আয়োজন খুবই প্রয়োজন—যাঁরা আলোয় না থেকেও শিল্পকে আলোকিত করেন।

গানে গানে জীবনের দলিল

পরবর্তী পর্বে শুরু হয় মূল গানের আসর। রফিকুল আলম, সামিনা চৌধুরী, পান্থ কানাই, জয় শাহরিয়ার, কিশোর দাশ ও রেনেসাঁ ব্যান্ড পরিবেশন করেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর কালজয়ী গান—‘তৃতীয় বিশ্ব এমনই বিস্ময়’, ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’, ‘হে বাংলাদেশ তোমার বয়স’, ‘সময় যেন কাটে না’সহ আরও অনেক। প্রতিটি গানের সঙ্গে জুড়ে যায় নেপথ্যের গল্প, যা শ্রোতাদের আরও কাছে টেনে আনে।

বই ও জীবনের বহুমাত্রিকতা

গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন জয় শাহরিয়ার, সহসম্পাদক নিশীথ সূর্য ও শাহরিয়ার আদনান। এতে নকীব খান, ফোয়াদ নাসের বাবু, কুমার বিশ্বজিৎ, পার্থ বড়ুয়া, লিটন অধিকারী রিন্টুসহ অনেকেই লিখেছেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গীকে নিয়ে। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যোদ্ধাদের—যা তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক।

১৯৫৬ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া শহীদ মাহমুদ জঙ্গী শুধু একজন গীতিকার নন—তিনি শিক্ষক, সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মী। গান কম লিখলেও তাঁর লেখা গানগুলো সময়, সমাজ ও মানুষের সংগ্রামের দলিল হয়ে আছে। তাই তাঁর ৭০ বছরে এই আয়োজন ছিল কেবল জন্মদিন নয়—এ ছিল বাংলাদেশের আধুনিক সংগীত ও ব্যান্ড সংস্কৃতির দীর্ঘ পথচলার প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধা।