আজ থেকে ১০টির বেশি সিম নিষিদ্ধ, ডিসেম্বরেই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আজ শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে নতুন একটি নির্দেশনা, যেখানে একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০টির বেশি সক্রিয় সিম রাখতে পারবেন না। পূর্ববর্তী নিয়মে এই সীমানা ছিল ১৫টি। সরকারের এই সিদ্ধান্ত গ্রাহক পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সিদ্ধান্তের পটভূমি ও নতুন নির্দেশনা

বিটিআরসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ থেকেই মোবাইল অপারেটরগুলো গ্রাহকদের অতিরিক্ত সিম নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতিপূর্বে একজন সাধারণ গ্রাহক তার এনআইডি ব্যবহার করে সব অপারেটর মিলিয়ে মোট ১৫টি সিম নিবন্ধন করতে পারতেন। তবে ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতা এবং সিম জালিয়াতি রোধে এই সংখ্যা কমিয়ে ১০টিতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, শনিবার থেকেই এই বিশেষ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তিনি আরও জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন করা হবে যাতে কোনোভাবেই একজন গ্রাহকের নামে ১০টির বেশি সক্রিয় সিম না থাকে। মূলত সিম ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ভুয়া নিবন্ধিত সিমের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

গ্রাহক ও সিম ব্যবহারের পরিসংখ্যানগত চিত্র

বাংলাদেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা এবং প্রকৃত গ্রাহকের সংখ্যার মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান রয়েছে। বিটিআরসির সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সিম ব্যবহারের একটি পরিসংখ্যানিক সারণি নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয়পরিসংখ্যান (আনুমানিক)
সক্রিয় সিমের মোট সংখ্যা (২০২৫ পর্যন্ত)১৮ কোটি ৬২ লাখ
প্রকৃত ইউনিক গ্রাহক সংখ্যা৬ কোটি ৭৫ লাখ
৫টির কম সিম ব্যবহারকারী গ্রাহক৮০ শতাংশের বেশি
৬ থেকে ১০টি সিম ব্যবহারকারী গ্রাহকপ্রায় ১৬ শতাংশ
১১টির বেশি সিম ব্যবহারকারী গ্রাহকমাত্র ৩ শতাংশ
নতুন নিয়ম অনুযায়ী সিমের সর্বোচ্চ সীমা১০টি

উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাত্র ৩ শতাংশ গ্রাহক এই নতুন নিয়মের কারণে সরাসরি প্রভাবিত হতে পারেন। তবে এই ক্ষুদ্র শতাংশ গ্রাহকের হাতে থাকা অতিরিক্ত সিমগুলো অনেক সময় নজরদারির বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে।


সিম নিষ্ক্রিয়করণের ‘দৈবচয়ন’ পদ্ধতি

অতিরিক্ত সিমগুলো নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে বিটিআরসি একটি বিশেষ পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যা ‘দৈবচয়ন’ বা র‍্যান্ডম সিলেকশন পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, এই পদ্ধতিতে কোনো প্রকার মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না। একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অতিরিক্ত সিমগুলো বাছাই করে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এর ফলে, যদি কোনো গ্রাহকের নামে ১০টির বেশি সিম থাকে, তবে কোন সিমগুলো চালু থাকবে আর কোনগুলো বন্ধ হবে, তা সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটার নির্ধারণ করবে। এতে করে গ্রাহকের গুরুত্বপূর্ণ কোনো নম্বর হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই বিটিআরসি পরামর্শ দিচ্ছে, গ্রাহকরা যেন নিজেরাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সিমগুলো অপারেটরের সহায়তায় বন্ধ করে দেন।

কেন এই কড়াকড়ি?

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এই কড়াকড়ির পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী কারণ রয়েছে:

১. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ভুয়া এনআইডি বা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সহজ হয়। সিমের সংখ্যা কমিয়ে আনলে নজরদারি বৃদ্ধি পায়।

২. প্রতারণা রোধ: মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে প্রতারণার ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত সিম ব্যবহার করা হয়। এই নিয়ম প্রতারকদের কর্মপরিধি কমিয়ে আনবে।

৩. বিপজ্জনক প্রচার ও স্প্যামিং: লটারি জেতা বা অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে পাঠানো খুদে বার্তাগুলো সাধারণত অবৈধভাবে নিবন্ধিত সিম থেকে পাঠানো হয়।

৪. জাতীয় ডেটাবেজ আপডেট: সিমের সঠিক তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হবে।

গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় করণীয়

আপনার নামে কতটি সিম নিবন্ধিত আছে তা জানা এখন সময়ের দাবি। বিটিআরসি গ্রাহকদের সুবিধার্থে একটি সহজ পদ্ধতি চালু রেখেছে। গ্রাহকরা চাইলেই তাদের মোবাইল থেকে *১৬০০২# ডায়াল করে ফিরতি মেসেজে তার এনআইডির শেষ ৪টি ডিজিট প্রদান করে নিবন্ধিত সিমের তালিকা জানতে পারবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার বা অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমেও এই তথ্য যাচাই করা সম্ভব।

যদি আপনার নামে ১০টির বেশি সিম থাকে, তবে অ্যালগরিদম দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হওয়ার আগেই আপনার প্রিয় বা প্রয়োজনীয় নম্বরটি সুরক্ষিত করতে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতিরিক্ত সিমগুলো সমর্পণ (Surrender) করা উচিত।

উপসংহার

বিটিআরসির এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্স এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও শুরুতে কিছু গ্রাহক বিড়ম্বনার শিকার হতে পারেন, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশে মোবাইল সিমের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলেই কেবল স্মার্ট ও নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে