১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। ঢাকার আকাশে নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্ত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাঙালি জাতির ওপর নৃশংস গণহত্যা শুরু করে। সেই রাতে ঢাকায় অবস্থানরত সব বিদেশি সাংবাদিককে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এবং পরদিন বিমানবন্দরে তোলা হয়, উদ্দেশ্য একটাই—ঢাকাকে সাংবাদিকশূন্য করা, যেন সেদিনের হত্যাযজ্ঞের খবর বাইরের পৃথিবীতে পৌঁছাতে না পারে।
কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের এই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ান মাত্র ২৫ বছরের ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। সামরিক আইন অমান্য করে, মৃত্যুর নিশ্চিত ঝুঁকি নিয়ে তিনি হোটেলের ভেতরেই আত্মগোপনে যান। কারণ তিনি জানতেন—যদি এই হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী না থাকেন, ইতিহাস মিথ্যাবাদীদের হাতে বন্দী হয়ে যাবে।
২৭ মার্চ সকালে কারফিউ শিথিল হলে, হোটেলের সাহসী কর্মচারীদের সহায়তায় একটি ছোট মোটরভ্যানে চড়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন ধ্বংসস্তূপে পরিণত ঢাকা দেখতে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভীষিকার দৃশ্য:
| স্থান | দৃশ্য ও ঘটনা |
|---|---|
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হল | ভাঙচুর ও আগুন |
| রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক | পাকিস্তানি সেনাদের গোলাবর্ষণ |
| পুরান ঢাকার অলিগলি | নিথর দেহ, আতঙ্কিত মানুষ |
| সাধারণ রাস্তা | জ্বলন্ত বাড়ি, নিহত ব্যক্তি |
৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত হয় তার ঐতিহাসিক প্রতিবেদন “Tanks Crush Revolt in Pakistan”, যা প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নগ্ন সত্য উন্মোচন করে।
সায়মন ড্রিংয়ের বাংলাদেশ সংক্রান্ত সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৬৮ সালে, যখন তিনি ঢাকায় প্রথম আগমন করেন। ৭ মার্চ ১৯৭১-এ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ তিনি প্রত্যক্ষ করেন। ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় জানতে চান, “আপনি কি আত্মগোপনে যাচ্ছেন?” বঙ্গবন্ধুর জবাব ছিল দৃঢ়—“না, আমাকে না পেলে ওরা সব কিছু ধ্বংস করে দেবে।”
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতে চলে যান, কলকাতা থেকে সংবাদ লন্ডনে পাঠাতে থাকেন এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিজয়ী ঢাকায় প্রবেশ করেন। পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে যুদ্ধোত্তর সাক্ষাতে জানতে পারেন—যদি মার্চে ধরা পড়তেন, তাঁকে গুলি করে মারা হতো।
ড্রিং বাংলাদেশের প্রতি আজীবন দায়বদ্ধ ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি দেশে ফিরে প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভি গড়ে তোলার মূল স্থপতি হন। ২০০২ সালে ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হয়ে বাংলাদেশ ছাড়তে হয় তাঁকে।
১৬ জুলাই ২০২১-এ চলে যান তিনি, এক অকৃত্রিম বন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা ও সত্যের সাহসী কণ্ঠ। সায়মন ড্রিং প্রমাণ করে গেছেন—দেশপ্রেম ও মানবতার কোনো সীমান্ত নেই।
শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি: সায়মন ড্রিং।
