কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার বিচার ও ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডের নন্দনপুর এলাকায় মহাসড়কের উভয় পাশে অবস্থান নেন তাঁরা। প্রায় দেড় ঘণ্টা বিক্ষোভের পর প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মহাসড়ক থেকে সরে যান শিক্ষার্থীরা।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে কোটবাড়ির দিকে যান। মিছিলটি নন্দনপুর এলাকায় পৌঁছানোর পর তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেন এবং হত্যাকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই দিকেই যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে কোটবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। দুর্ভোগে পড়েন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী যানসহ বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রী ও চালকেরা। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবির বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে দ্রুত ও স্পষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহা খানম বলেন, অপ্রতিম হত্যার বিচার নিশ্চিত করা এবং কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতেই তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছেন।
বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অঞ্জন রায় বলেন, অপ্রতিমের জানাজা শেষ হলেও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে তাঁরা বিস্তারিত তথ্য পাননি। শিক্ষার্থীদের সামনে ঘটনাটির পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, শুধু কক্ষে বসে সংবাদ সম্মেলন করলে হবে না; ঘটনাস্থল ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের কাছে তথ্য জানাতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আবদুল হাকিম জানান, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর অল্প সময়ের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে কয়েকজনকে আটক করেছে। অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হলে তাঁরা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তাঁদের শনাক্ত ও আটক করা হয় বলে জানা গেছে। পরে আটক তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল এবং আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মামলাটি করা হয়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। নির্ধারিত সময়ের পরও বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। এরপর পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ব্যক্তিরা বিভিন্ন এলাকায় তার সন্ধানে তল্লাশি চালান।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২১ থেকে ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন স্থান থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নেমে আসে শোক ও ক্ষোভ।
তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই ফুটেজের সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার পর তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই সঙ্গে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মুঠোফোনটি উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই দিনে তাঁরা মানববন্ধন করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইন অনুযায়ী শাস্তির দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামের পর এখন তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়। একই সঙ্গে অপ্রতিম কীভাবে নিখোঁজ হলো, কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে এবং ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর চান শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যরা। তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।









