ফেনীতে অপহরণের পর পরিচয় ফাঁসের আশঙ্কায় এক স্কুলছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে তিন তরুণকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নৃশংস এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার, একই সঙ্গে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর। অন্য দিনের মতো কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছিল ফেনী গ্রামার স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন (১০)। পথে তাকে অপহরণ করা হয়। কিছুক্ষণ পর অপহরণকারীরা আহনাফের বাবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু অপহরণকারীদের একজনকে চিনে ফেলায় শিশুটির জীবন সংকটে পড়ে। পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয় থেকে অপহরণকারীরা তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার চেষ্টা চালায়।
চার দিন পর, ১২ ডিসেম্বর, ফেনী সদর উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ রেললাইনের পাশের একটি ডোবা থেকে পুলিশ আহনাফের মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন আহনাফের বাবা মাঈন উদ্দিন বাদী হয়ে থানায় হত্যা ও অপহরণের মামলা করেন। তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি আসে—ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাঁরা আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ এন এম মোরশেদ খান দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—আশরাফ হোসেন চৌধুরী (২০), মো. মোবারক হোসেন (২০) এবং ওমর ফারুক (২০)। রায় ঘোষণার সময় তিনজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পরপরই কড়া নিরাপত্তায় তাঁদের জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলায় মোট ২২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং ২৫ মে আদালত তা গ্রহণ করে। রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকারি কৌঁসুলি মো. শাহাব উদ্দিন আহাম্মদ ও সহকারী সরকারি কৌঁসুলি মেজবাহ উদ্দিন খান। আসামিপক্ষে ছিলেন সাব্বির উদ্দিন, কামরুল হাসান ও সামছুদ্দিন মানিক।
নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| ধাপ | তারিখ | বিবরণ |
|---|---|---|
| অপহরণ | ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ | কোচিং শেষে ফেরার পথে আহনাফ অপহৃত |
| মরদেহ উদ্ধার | ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ | দেওয়ানগঞ্জ রেললাইনের পাশে ডোবা থেকে উদ্ধার |
| মামলা দায়ের | ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ | বাবা মাঈন উদ্দিন বাদী |
| গ্রেপ্তার ও জবানবন্দি | ডিসেম্বর ২০২৪ | তিন আসামির স্বীকারোক্তি |
| অভিযোগপত্র | ৩০ মার্চ ২০২৫ | পুলিশের দাখিল |
| অভিযোগপত্র গ্রহণ | ২৫ মে ২০২৫ | আদালতের অনুমোদন |
| রায় | বৃহস্পতিবার | তিনজনের মৃত্যুদণ্ড |
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আহনাফের বাবা মাঈন উদ্দিন বলেন, “আমার ছোট ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় ন্যায়বিচার পেয়েছি বলে মনে করি। দ্রুত ফাঁসির রায় কার্যকরের দাবি জানাই।” তাঁর এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে এক পিতার শোক, ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা—যা সমাজকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠোর বার্তা দেয়।
