বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্তৃক ফার্নেস তেলের দাম বিশ্ববাজারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না রাখায় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গত দেড় বছরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশে তা সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পিডিবির কাছ থেকে ৬৪৪ কোটি টাকা বাড়তি নিয়েছে বিপিসি। সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত এক গণশুনানিতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
শুনানির প্রেক্ষাপট ও দাম নির্ধারণের প্রস্তাব
বিপিসি এবং এর সহযোগী বিপণন সংস্থাগুলো (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল) প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ৮১ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে এই তেলের বিক্রয়মূল্য লিটারপ্রতি ৮৬ টাকা। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি তাদের পর্যালোচনায় বলেছে, এই দাম সর্বোচ্চ ৭৪ টাকা ৪ পয়সা হওয়া উচিত। অন্যদিকে, পিডিবি এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের প্রকৃত দাম হওয়া উচিত ৫০ টাকা ৮৩ পয়সা।
নিচে ফার্নেস তেলের দাম সংক্রান্ত বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবনা ও বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: ফার্নেস তেলের দাম নির্ধারণে বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবনা
| প্রস্তাবকারী পক্ষ | প্রস্তাবিত/বর্তমান মূল্য (প্রতি লিটার) | মন্তব্য |
| বর্তমান বাজার দর | ৮৬.০০ টাকা | বিপিসি কর্তৃক নির্ধারিত (আগস্ট ২০২৪) |
| বিপিসির নতুন প্রস্তাব | ৮১.০০ টাকা | ৫ টাকা কমানোর প্রস্তাব |
| বিইআরসি কারিগরি কমিটি | ৭৪.০৪ টাকা | খরচ বিশ্লেষণ পরবর্তী মূল্যায়ন |
| পিডিবির প্রস্তাব | ৫০.৮৩ টাকা | আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ |
পিডিবির সংকট ও বিপিসির মুনাফা
গণশুনানিতে পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরাসরি আমদানি করে কম দামে তেল পেলেও পিডিবিকে বিপিসির কাছ থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবি সরকারকে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে বাধ্য করেছে এবং ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। অথচ একই সময়ে তেল বিক্রি করে বিপিসি ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে।
দেশে বর্তমানে ৫৪টি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গত অর্থবছরে এসব কেন্দ্রে প্রায় ২৩ লাখ টন তেল ব্যবহৃত হয়েছে। পিডিবির অভিযোগ, বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতাকে পাশ কাটিয়ে বাড়তি অর্থ আদায় করছে, যা সরাসরি সাধারণ জনগণের পকেট থেকে যাওয়া বিদ্যুতের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিপণন কোম্পানিগুলোর মার্জিন বৃদ্ধির দাবি
তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলো যেমন—পদ্মা অয়েল, তাদের বিতরণ চার্জ ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ২০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে। যদিও শুনানিতে তারা স্বীকার করেছে যে, আগের বছরের তুলনায় তাদের মোট মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিইআরসির কারিগরি কমিটি এই চার্জ ৮৫ পয়সা করার পক্ষে মত দিয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, প্রাপ্ত সকল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সবার স্বার্থ রক্ষা হয় এমন একটি সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ বা সংশ্লিষ্ট যে কেউ লিখিত মতামত জমা দিতে পারবেন। ফার্নেস তেলের দামের এই অসামঞ্জস্য দূর করা না গেলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছে পিডিবি।
