নাটোরের লালপুরে একটি ঐতিহ্যবাহী ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচে প্রধান অতিথি না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘১৪৪ ধারা’ জারির ভুয়া ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক এক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে। মাইক ভাড়া করে গ্রামে এ ঘোষণা দেওয়ার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার কারণে বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী ওই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ স্থগিত হয়ে যায়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) উপজেলার কেশবপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কেশবপুর গ্রামে প্রায় ৬০ বছর ধরে নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়ে আসছে। গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অতিথি করার প্রচলন নেই। খেলা শেষে গ্রামের প্রবীণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাই বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতিই এবারও অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন আয়োজকেরা।
এবারের টুর্নামেন্ট শুরু হয় প্রায় ১৫ দিন আগে। এতে স্থানীয় কলেজ, বিদ্যালয়, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও চাকরিজীবীদের বিভিন্ন দল অংশ নেয়। কয়েক ধাপের প্রতিযোগিতা শেষে শুক্রবার জুমার নামাজের পর ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ম্যাচটি ঘিরে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
আয়োজক কমিটির সদস্য মাহবুবের ভাষ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই লালপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মারুফ আলী ফাইনাল ম্যাচে লালপুরের সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মলামকে প্রধান অতিথি করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে নিজেকে বিশেষ অতিথি করার দাবিও করেন তিনি।
তবে আয়োজকেরা টুর্নামেন্টের পুরোনো রীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। ফলে তার দাবি গ্রহণ করা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে মারুফ আলী নিজ উদ্যোগে মাইক ভাড়া করে গ্রামে ঘোষণা দিতে থাকেন, খেলার মাঠে ‘১৪৪ ধারা’ জারি করা হয়েছে এবং সেখানে কেউ খেলতে পারবেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ঘোষণা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার অধীনে কোনো এলাকায় সমাবেশ বা চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে মাইকিং করে কেউ এ ধরনের আদেশ জারি করতে পারেন না।
মাইকে এমন ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ার পরপরই কেশবপুরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফাইনাল ম্যাচে অংশ নিতে আসা খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কেশবপুরের গ্রামপ্রধান আজিজুর রহমান বলেন, ভিত্তিহীন ওই ঘোষণার কারণে দীর্ঘদিনের একটি সুন্দর আয়োজন নষ্ট হয়েছে। গ্রামের মানুষের মধ্যে অযথা উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অপর গ্রামপ্রধান আবুল কালাম আজাদ বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া কেউ ১৪৪ ধারা জারি করতে পারেন না। তার অভিযোগ, এ ধরনের ভুয়া ঘোষণা দিয়ে একটি সামাজিক ও ক্রীড়া আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ মারুফ আলী ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে নজরুল ইসলাম মলাম বলেন, তাঁকে ফাইনাল ম্যাচের প্রধান অতিথি করার বিষয়ে তিনি কাউকে কোনো নির্দেশ দেননি। বিষয়টি জানার পর মারুফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রায় ছয় দশকের পুরোনো একটি স্থানীয় ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা নিয়ে কেশবপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, গ্রামবাসীর অংশগ্রহণে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা খেলাধুলার আয়োজন রাজনৈতিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত দাবি-দাওয়ার কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত। তাঁদের প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








