দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে যাত্রীসেবা আধুনিকায়ন ও দ্রুততর করার লক্ষ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত ‘ই-গেট’ বা স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বর্তমানে শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৪৪টি ই-গেট এখন সাধারণ যাত্রীদের জন্য উপকারের চেয়ে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ গেটই কারিগরি ত্রুটি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে বন্ধ থাকায় বিদেশের মাটিতে পা রাখার আগেই হযরানি ও দীর্ঘ লাইনের মুখে পড়তে হচ্ছে ই-পাসপোর্টধারী যাত্রীদের।
Table of Contents
প্রকল্পের বিশাল ব্যয় ও বর্তমান অসারতা
২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন’ প্রকল্পের অধীনে এই ই-গেট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তা বেড়ে ৯ হাজার ৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে ৪৪টি ই-গেট স্থাপনে সরাসরি ব্যয় হয় ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। জার্মান সংস্থা ভেরিডোস জিএমবিএইচের তত্ত্বাবধানে স্থাপিত এই গেটগুলো এখন ধুলো জমিয়ে বিমানবন্দরের কোনো এক কোণে পড়ে আছে।
স্থাপিত ই-গেটসমূহের অবস্থান ও সংখ্যা:
| বন্দরের নাম | ই-গেটের সংখ্যা | বর্তমান সক্ষমতা |
| শাহজালাল বিমানবন্দর, ঢাকা | ২৬টি | অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা হয়েছে। |
| শাহ আমানত বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম | ০৬টি | কারিগরি ত্রুটির কারণে অকার্যকর। |
| ওসমানী বিমানবন্দর, সিলেট | ০৬টি | ব্যবহারকারী নেই বললেই চলে। |
| বেনাপোল স্থলবন্দর | ০৪টি | সচল থাকলেও বিড়ম্বনা কমেনি। |
| বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর | ০২টি | অনিয়মিত কার্যক্রম। |
১৮ সেকেন্ডের প্রতিশ্রুতি বনাম ম্যানুয়াল হয়রানি
কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি ছিল, ই-গেট ব্যবহারের মাধ্যমে একজন যাত্রী মাত্র ১৮ সেকেন্ডে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ই-গেট কেবল পাসপোর্ট শনাক্ত করতে পারলেও যাত্রীর ভিসা যাচাই করতে অক্ষম। ফলে গেট পার হওয়ার পর যাত্রীকে পুনরায় ইমিগ্রেশন ডেস্কে লাইনে দাঁড়িয়ে ভিসার সত্যতা প্রমাণ করতে হয়। এতে ডিজিটাল সেবার সুফল পাওয়ার বদলে যাত্রীদের সময় নষ্ট হচ্ছে দ্বিগুণ। অনেক ক্ষেত্রে ই-গেটের সফটওয়্যারের সাথে মূল ইমিগ্রেশন সার্ভারের ডেটা আদান-প্রদান না হওয়ায় ইমিগ্রেশন পুলিশ সরাসরি গেটগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তি ও সীমাবদ্ধতা
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ যাত্রীর ই-পাসপোর্ট থাকলেও ই-গেটে শুধু পাসপোর্ট রিড করার ব্যবস্থা রয়েছে। যাত্রী কোন বিমানে যাবেন বা তাঁর ভিসার মেয়াদ কতদিন—এই তথ্যগুলো গেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হয় না। শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জানিয়েছেন, ভিসা যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এবং উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় ই-গেট বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এটি সচল করার জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও যাত্রীদের ক্ষোভ
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে কেনা এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না হওয়া চরম দায়িত্বহীনতা। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর বা উন্নত বিশ্বে ডিজিটাল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার কারণে জনবল সাশ্রয় হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশে তা বিড়ম্বনার জন্ম দিচ্ছে। এদিকে নিয়মিত ভ্রমণকারী যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ই-পাসপোর্ট করার সময় আধুনিক সেবার যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, ই-গেট অকেজো থাকায় তা এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
উপসংহার
৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি কেবল কারিগরি অদূরদর্শিতার কারণে ব্যর্থ হতে চলেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে এই মূল্যবান ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিগুলো চিরতরে অকেজো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে ই-গেটের সাথে ভিসা ভেরিফিকেশন সিস্টেমের সমন্বয় ঘটিয়ে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা। অন্যথায় এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল দুর্নীতির তকমা হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।
