মানুষের মৃত্যু কখন, কোথায় এবং কীভাবে হবে—তা আগাম বলা অসম্ভব। তবে মাঝেমধ্যে কিছু ঘটনা এমনভাবে ঘটে, যা দেখে মনে হয় মানুষ হয়তো তার বিদায়ের বার্তা আগেভাগেই টের পেয়েছিল। ঠিক তেমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ী ও তরুণ উদ্যোক্তা আবদুল মালেকের জীবনে। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো এই তরুণের শেষ ইচ্ছা ছিল তার জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে মা-বাবার কবরের পাশেই যেন তাকে সমাহিত করা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সুস্থ-সবল থাকা অবস্থাতেই তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বায়োতে এই অন্তিম ইচ্ছার কথা লিখে রেখেছিলেন।
Table of Contents
দুর্ঘটনার বিবরণ ও মৃত্যুসংবাদ
আজ বুধবার দুপুর তিনটার দিকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রামু উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় একটি মালবাহী ট্রাকের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে আবদুল মালেকের মৃত্যু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মালেক একটি অটোরিকশায় করে কক্সবাজার শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। বাংলাবাজার এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ট্রাক অটোরিকশাটিকে সরাসরি ধাক্কা দেয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় মালেকসহ তিনজনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মালেককে মৃত ঘোষণা করেন।
জীবনের গল্প ও অপূর্ণ স্বপ্ন
আবদুল মালেক সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি কেবল একজন সফল পর্যটন ব্যবসায়ীই ছিলেন না, বরং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (আইআইইউসি) থেকে এলএলএম ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি আইন পেশায় না গিয়ে নিজের দ্বীপে ‘সি-প্রবাল’ নামক একটি রিসোর্ট পরিচালনা করতেন। এর পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে দ্বীপের পর্যটন প্রসারে কাজ করতেন।
সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সব প্রস্তুতিও তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে রামুর জোয়ারিয়ানালা বিকেএসপি কেন্দ্রে তিন দিনের একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত, আজ প্রশিক্ষণের শেষ দিন শেষে বাড়ি ফেরার পথেই তিনি ঘাতক ট্রাকের কবলে পড়েন।
নিহত আবদুল মালেকের জীবনবৃত্তান্ত একনজরে
| বিষয় | তথ্য |
| নাম | আবদুল মালেক (৩৩) |
| ঠিকানা | পশ্চিম পাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ |
| শিক্ষা | এলএলএম (আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়) |
| পেশা | রিসোর্ট মালিক, সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর |
| ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা | সৌদি আরবে কর্মসংস্থান |
| দুর্ঘটনার স্থান | বাংলাবাজার এলাকা, রামু, কক্সবাজার |
| অন্তিম ইচ্ছা | সেন্ট মার্টিনে বাবা-মায়ের পাশে কবর দেওয়া |
শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
আবদুল মালেকের অকাল প্রয়াণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ কক্সবাজারের সচেতন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, ময়নাতদন্ত শেষে মালেকের মরদেহ সড়কপথে টেকনাফে নেওয়া হবে। এরপর সেখান থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে ট্রলারযোগে মরদেহ পৌঁছাবে তার প্রিয় জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে।
তার ফেসবুক প্রোফাইলের সেই বিশেষ অনুরোধটি এখন সবার চোখে জল আনছে। যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুর পর আমার লাশটি জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে বাবা–মায়ের কবরের পাশে শায়িত করিও।’ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, তার এই প্রফেটিক বা ভবিষ্যৎবাণীর মতো লেখা ইচ্ছাটিই এখন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মালেক হয়তো চলে গেছেন, কিন্তু তার এই অকাল বিদায় এবং ফেলে যাওয়া স্বপ্নগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সেন্ট মার্টিনের সৈকতে বারবার আছড়ে পড়বে।
