আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মাসুদ। তবে এই মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই দলটির ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার অতি-ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে আসায় তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ ও আনিসুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, মাসুদের রাজনৈতিক অতীত বিএনপির আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। বিশেষ করে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী তৌফিকা করিমের সঙ্গে মাসুদের গভীর ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ছিল।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাদের সরাসরি সহযোগিতায় মাসুদ ‘সিটিজেন ব্যাংক’-এর পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং আনিসুল হকের অবর্তমানে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বর্তমানে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একজন সাবেক আওয়ামী ঘনিষ্ট ব্যক্তির এভাবে রাতারাতি বিএনপির শীর্ষ প্রার্থী হওয়াকে অনেকে ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন।
ব্যবসায়িক অনিয়ম ও দখলদারিত্বের অভিযোগ
ব্যবসায়িক অঙ্গনে মাসুদের ‘মডেল গ্রুপ’-এর কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই গ্রুপের ব্যানারে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বিভিন্ন স্থানে জমি দখল ও নানাবিধ অনিয়মে লিপ্ত ছিলেন।
পাশাপাশি, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবশালী তিনটি বলয়—গাজী পরিবার, সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং ওসমান পরিবারের সঙ্গেও তার সমান যাতায়াত ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। স্থানীয়রা বলছেন, যিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাকে ধানের শীষের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রতি এক প্রকার অবিচার।
একনজরে মনোনয়ন বিতর্ক ও মাসুদের প্রেক্ষাপট
বিএনপির এই প্রার্থীর বিতর্কিত দিকগুলো বুঝতে নিচের সারণিটি লক্ষ্য করা যেতে পারে:
| তথ্যের বিষয় | বিবরণ ও সংশ্লিষ্টতা |
| মনোনয়ন প্রাপ্ত আসন | নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) |
| মূল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান | মডেল গ্রুপ (গার্মেন্টস সেক্টর) |
| বর্তমান পদ (ব্যাংকিং) | চেয়ারম্যান, সিটিজেন ব্যাংক |
| বিগত রাজনৈতিক সম্পর্ক | আনিসুল হক, তৌফিকা করিম ও ওসমান পরিবার |
| বিএনপিতে যোগদানের সময় | নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে |
| প্রধান অভিযোগ | অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন ও বিতর্কিত অতীত |
| বর্তমান অবস্থা | দলের একাংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে |
‘তাক করা’ প্রার্থী ও তৃণমূলের ক্ষোভ
বিএনপি সারাদেশে মোট ২৩৭টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে মাসুদের প্রার্থিতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। দলীয় একটি সূত্রের দাবি, কয়েক মাস আগে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কেনেন মাসুদ এবং খুব সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগদান করেন। এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দলের গুরুত্বপূর্ণ আসন পাওয়া নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে যে, বিপুল অর্থের বিনিময়ে তিনি এই মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন।
তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কি তার এই বিতর্কিত অতীত ও আওয়ামী লীগের সাথে সখ্যের বিষয়ে সম্যক অবগত? দীর্ঘ দেড় দশক যারা জেল-জুলুম সহ্য করে দলটিকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের বাদ দিয়ে একজন ‘সুবিধাবাদী’ ব্যবসায়ীকে গুরুত্ব দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্বস্তি বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্তকরণ বিএনপির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এটি কেবল তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ সৃষ্টি করবে না, বরং ভোটারদের কাছে দলের স্বচ্ছতা নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দেবে। যদি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের উপেক্ষা করে আর্থিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে নির্বাচনের মাঠে দলীয় ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে এখন দেখার বিষয়, বিএনপি তাদের এই সিদ্ধান্তে অটল থাকে নাকি তৃণমূলের দাবির মুখে মনোনয়নে কোনো পরিবর্তন আনে।









