বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এবং ফরাসি ট্র্যাক সাইক্লিংয়ের কিংবদন্তি চার্লস কস্তে ১০১ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। ১৯২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই অ্যাথলেট কেবল একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ফরাসি ক্রীড়া ঐতিহ্যের এক জীবন্ত আর্কাইভ। ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিয়ানা ফেরারি গভীর শোক প্রকাশ করে কস্তের মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
Table of Contents
এক বর্ণিল জীবন ও যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ
চার্লস কস্তের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। যুদ্ধের আগেই তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল সাইক্লিস্ট হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে যুদ্ধের ডামাডোলে অনেক অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার থমকে গেলেও কস্তে দমে যাননি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই তিনি পূর্ণ উদ্যমে ট্র্যাকে ফিরে আসেন এবং ১৯৪৭ সালে ফ্রান্সের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেন। তার এই অদম্য স্পৃহা তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফ্রান্সের তরুণদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও স্বর্ণ জয়
চার্লস কস্তের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, লন্ডনে আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে। ছেলেদের টিম পারস্যুট ইভেন্টে তিনি ফ্রান্স দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। সেই আসরে ফরাসি দলের জয়ে তার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রিটেনকে পরাজিত করার পর ফাইনালে শক্তিশালী ইতালির মুখোমুখি হয় ফ্রান্স। কস্তের দুর্দান্ত গতি ও কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে ইতালিকে রৌপ্য পদক নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় এবং ফ্রান্সের গলায় ওঠে কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণপদক।
একনজরে চার্লস কস্তের জীবন ও অর্জনসমূহ
কস্তের দীর্ঘ কর্মজীবন ও মাইলফলকগুলো নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| পুরো নাম | চার্লস কস্তে (Charles Coste) |
| জন্ম তারিখ | ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৪ |
| মৃত্যুকালীন বয়স | ১০১ বছর |
| ক্রীড়া ক্ষেত্র | ট্র্যাক সাইক্লিং |
| প্রধান অর্জন | ১৯৪৮ লন্ডন অলিম্পিকে স্বর্ণপদক (টিম পারস্যুট) |
| জাতীয় স্বীকৃতি | ফরাসি জাতীয় চ্যাম্পিয়ন (১৯৪৭) |
| সর্বশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্ত | ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের মশালবাহক |
| পদ মর্যাদা | বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন (মৃত্যুর আগ পর্যন্ত) |
প্যারিস ২০২৪: শেষ বিদায়ের আগে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে চার্লস কস্তে এক অনন্য সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২৬ জুলাই, প্যারিস অলিম্পিকের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি মশালবাহকের দায়িত্ব পালন করেন। প্যারিসের বিখ্যাত টুইলারি বাগানে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝে হুইলচেয়ারে বসে ১০১ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ যখন ফরাসি কিংবদন্তি জুডোকা টেডি রিনারের হাতে অলিম্পিক মশাল তুলে দেন, তখন পুরো বিশ্ব দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল।
কস্তে নিজে এই মুহূর্তটিকে তার দীর্ঘ জীবনের “সবচেয়ে সুন্দর ও রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলোর একটি” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ১০১ বছর বয়সে এসে নিজ দেশে আয়োজিত অলিম্পিকে এমন ভূমিকা পালন করা ছিল তার জন্য এক বৃত্তপূরণের মতো ঘটনা।
প্রস্থান ও শূন্যতা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাঙ্গেরিয়ান জিমন্যাস্ট আগনেস কেলেতির মৃত্যু হওয়ার পর থেকে চার্লস কস্তে ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। তার মৃত্যুতে ফ্রান্স কেবল একজন পদকজয়ীকে হারায়নি, বরং হারিয়েছে অলিম্পিক আন্দোলনের এক মহান দূতকে।
ফ্রান্সের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিয়ানা ফেরারি তার শোকবার্তায় বলেন, ‘অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা আমাদের প্রিয় লন্ডন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন চার্লস কস্তেকে বিদায় জানাচ্ছি। তিনি ফরাসি সাইক্লিং ও বিশ্ব ক্রীড়া ইতিহাসে যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রেখে গেছেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার প্রয়াণ আমাদের ক্রীড়া পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’
কস্তের এই বিদায় কেবল একটি পরিসংখ্যানের অবসান নয়, বরং এক শতাব্দীর সাহসিকতা ও অলিম্পিক স্পিরিটের এক মহাকাব্যের সমাপ্তি। ফ্রান্স তথা পুরো বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীরা তাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করবে।
