সৌদির মরুতে গোলাপের নগরী তায়েফ : সুগন্ধির ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখছেন তালহি

সৌদি আরবের তায়েফ মরুভূমির মাঝেও গোলাপের শহর হিসেবে পরিচিত। এখানকার বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী খালাফুল্লাহ আল-তালহি গোলাপ চাষে কাটিয়ে দিয়েছেন দশকের পর দশক। তাঁর হাত ধরে মরু-গোলাপের সুবাস আজও বন্দি হচ্ছে সুগন্ধির বোতলে।

“আমি গোলাপকে এতটাই ভালোবাসি যে, সন্তানের চেয়েও বেশি যত্ন নিই,” নিজের ফুলের খামারে দাঁড়িয়ে বলেন তালহি।

পশ্চিম সৌদি আরবের পাহাড়ি শহর তায়েফে প্রায় ৮০০ ফুলের খামারে প্রতিবছর উৎপাদিত হয় প্রায় ৩০ কোটি গোলাপ। এর মধ্যে তালহি নিজেই উৎপাদন করেন ৫০ থেকে ৬০ লাখ। বসন্তকালে আবহাওয়া শীতল হলে মরুভূমির বুক জুড়ে ফুটে ওঠে লাল, গোলাপি আর সাদা গোলাপের বাহারি রঙ।

সূর্য ওঠা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শ্রমিকেরা হাতে হাতে ফুল তোলে। পরে এগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিজিয়ে ও জ্বাল দিয়ে বানানো হয় আতর ও গোলাপজল। এসব সুগন্ধি শুধু সৌদি আরবে নয়, হজ ও ওমরাহ পালন করতে আসা মুসল্লিদের কাছেও সমান জনপ্রিয়।

বছরের পর বছর ধরে এই গোলাপ-আতর ব্যবহার হয়ে আসছে মক্কার কাবা শরিফ ধোয়ার কাজেও। তবে উৎপাদন সীমিত হওয়ায় তায়েফের আতর রপ্তানির সুযোগ খুবই কম। স্থানীয় চাহিদাই পূরণে হিমশিম খেতে হয় চাষিদের। “আমাদের দেশে অনেকেই শুধু গোলাপ আতরই ব্যবহার করেন,” জানালেন তালহি।

তবে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নতুন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত আবহাওয়া তায়েফের গোলাপ চাষের জন্য বড় হুমকি। কখনও তীব্র গরম, কখনও হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ আবার কখনও আকস্মিক বন্যা ফসলের ক্ষতি করছে।

“গত বছর আর তার আগের বছর খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। অনেকে একটি গোলাপও তুলতে পারেননি,” জানালেন তালহি। যদিও এবারের মৌসুম তুলনামূলক সহনীয়।

জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবে কৃষিজমির মান ও উৎপাদনশীলতা আরও কমে যেতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে গম, খেজুরসহ গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ফলন কমার আশঙ্কা রয়েছে।

তালহি অবশ্য দমে যাননি। বয়স ৮০ হলেও এখনো প্রতিদিন ভোরে উঠে খামারে যান এবং রাত পর্যন্ত কাজ করেন।

“এই খামারই আমার প্রাণ। মৃত্যুই একমাত্র আমাকে এখান থেকে আলাদা করতে পারবে,” বললেন তিনি।

মরুভূমির এই গোলাপনগরী তায়েফ তাই শুধু সৌন্দর্য নয়, সুগন্ধির ইতিহাস আর এক অনবদ্য মানবিক গল্পেরও স্মারক।