,

গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ মনির খানকে মারধর করেছিলেন গ্রামবাসী

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খানের সংগীতজীবনের শুরুটা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাবার কিনে দেওয়া হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন তিনি। কিন্তু সেই সংগীতচর্চাকে কেন্দ্র করেই গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে ও তাঁর বাবাকে মারধর করা হয়। শুধু গান গাওয়ার কারণে নিজের বিরুদ্ধে সাত থেকে আটটি মামলা হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন এই কণ্ঠশিল্পী।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মাছরাঙা টেলিভিশনকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন মনির খান। তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে সংগীতচর্চা নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা, শারীরিক নির্যাতন, আইনি জটিলতা এবং ছেলের প্রতিভার প্রতি বাবার অবিচল সমর্থনের গল্প।

মনির খান জানান, নিজের বাড়িতে গান গাওয়ার কারণে গ্রামের এক ধর্মীয় ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন। বিষয়টি একপর্যায়ে গুরুতর রূপ নেয়। তাঁর দাবি, গান গাওয়ার কারণে তাঁর নামে সাত থেকে আটটি মামলা করা হয়েছিল। পরিস্থিতির কারণে তাঁকে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে।

নির্যাতনের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একদল লোক তাঁদের বাড়িতে এসেছিল হারমোনিয়াম ভাঙতে। তখন তিনি বাদ্যযন্ত্রটি জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন। তাঁকে মারধর করা হলে তাঁর বাবা মাহবুব আলী খান ছেলেকে ও হারমোনিয়ামকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর বাবার পিঠেও আঘাত লাগে।

শৈশব-কৈশোরের সেই অভিজ্ঞতা মনির খানের মনে গভীর দাগ কেটেছে। যে বাবা ছেলের প্রতিভা চিনে তাঁকে সংগীতের পথে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তাঁকেও সেই স্বপ্নের কারণে সামাজিক বিরোধ ও শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

ছেলের প্রতিভা চিনেছিলেন স্কুলশিক্ষক বাবা

মনির খানের বাবা মাহবুব আলী খান ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি সন্তানদের শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলতে চাইতেন। পড়াশোনা, দৈনন্দিন কাজ কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। মনির খানের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, তাঁর বাবা প্রতিটি পদক্ষেপ ভেবেচিন্তে নিতেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করতেন মনির খান। সংগীতের প্রতিও তাঁর স্বাভাবিক আগ্রহ ছিল। ছেলের এই প্রতিভা লক্ষ করেই তাঁকে গান শেখানোর কথা ভাবেন মাহবুব আলী খান।

মনির খান জানান, এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফল প্রকাশ হতে সে সময় প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস লাগত। পরীক্ষা শেষে দীর্ঘ অবসর থাকায় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপ করে সময় কাটাতেন। এই সময়টিকে কাজে লাগানোর কথা ভাবেন তাঁর বাবা। ছেলের সংগীতপ্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।

সেই ভাবনা থেকেই একদিন ছেলেকে নিয়ে হারমোনিয়াম কিনতে যান মাহবুব আলী খান। মনির খানের স্মৃতিতে ঘটনাটি আজও বিশেষভাবে জায়গা করে আছে। বাবা-ছেলে প্রায় ১৭ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে হারমোনিয়াম কিনতে গিয়েছিলেন।

বাবার এই উদ্যোগ ছিল ছেলের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মনিরের মধ্যে যে প্রতিভা রয়েছে, সেটিকে পরিচর্যা করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে সেই স্বপ্নের পথে যে এত বাধা আসবে, তা তাঁদের জন্য কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়।

বাধা পেরিয়ে ছেলের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত

সংগীতচর্চা নিয়ে বিরোধের কারণে মাহবুব আলী খানকে সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে জানান মনির খান। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা সত্ত্বেও ছেলের প্রতিভার প্রতি আস্থা হারাননি তাঁর বাবা।

মনির খানের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা মনে করতেন, আল্লাহ যে প্রতিভা দিয়েছেন, তা প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। সেই প্রতিভাকে বাস্তবে রূপ দিতে যত বাধাই আসুক, তিনি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করবেন।

ছেলের প্রতি বাবার এই সমর্থন মনির খানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিকূল পরিবেশেও সংগীতের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার সাহস পান তিনি। বাবার বিশ্বাস ছিল, অন্যের আপত্তির কারণে ছেলের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

মনির খান জানান, তাঁর বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে যেন তাঁর স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। বাবার এই মনোভাব মনির খানের সংগীতজীবনের শুরুর দিনগুলোতে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।

কাঠগড়ায় গান গেয়ে খালাস পাওয়ার স্মৃতি

গান গাওয়াকে কেন্দ্র করে মামলার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন মনির খান। তাঁর দাবি, একসময় তাঁকে পালিয়ে থাকতে হতো। সেই সময়ের একটি মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার পর বিচারক তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন।

মনির খানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর জামিন পাওয়ার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে সাক্ষাৎকারে মামলাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা সংশ্লিষ্ট আদালতের পরিচয় তুলে ধরেননি তিনি। ফলে ঘটনাটির পূর্ণ আইনি প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগীতচর্চা চালিয়ে যান মনির খান। তিনি সংগীতের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে শুরু করেন। তাঁর প্রথম সংগীতগুরু ছিলেন রেজা খোসরু। গানের প্রতি আগ্রহ এবং বাবার অনুপ্রেরণা তাঁকে এই পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে অনুভব করেন একাকিত্ব

সংগীতজীবনে এগিয়ে যাওয়ার আশায় একসময় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন মনির খান। তবে নতুন শহরে এসে তাঁকে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। পরিচিত পরিবেশ ও পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকার কারণে বাবার অভাব আরও বেশি অনুভব করতেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে মনির খান জানান, ঢাকায় এসে চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড় দেখলেও নিজেকে একা মনে হতো। এত বড় শহরে তাঁর ইচ্ছা ও প্রতিভার মূল্য কে দেবে, কার কাছে গেলে সহযোগিতা পাওয়া যাবে—এমন প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তুলত।

এই সময় তাঁর পাশে দাঁড়ান গ্রামের বড় ভাই নূরুজ্জামান খোকন। তিনি পেশায় আইনজীবী। মনির খানের বক্তব্য অনুযায়ী, নূরুজ্জামান খোকন গ্রামে গিয়ে তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং ছেলেকে ঢাকায় পাঠানোর অনুরোধ জানান। তাঁর ধারণা ছিল, গ্রামে থাকলে মনির খানের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

পরে নূরুজ্জামান খোকনের সহযোগিতায় ঢাকায় থেকে টিউশনি করার পাশাপাশি সংগীতচর্চা চালিয়ে যান মনির খান। জীবনের অনিশ্চিত সেই সময়ে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকার এই প্রচেষ্টা তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

বাবার স্মৃতি ও শিক্ষা আজও অমূল্য

মনির খান তাঁর বাবা মাহবুব আলী খানকে হারান ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। বাবার মৃত্যুর পরও তাঁর শেখানো মূল্যবোধ ও জীবনবোধ শিল্পীর মনে গভীরভাবে জায়গা করে আছে।

বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনির খান বলেন, তাঁর বাবা প্রায়ই বোঝাতেন, তিনি ধনকুবের নন; কিন্তু সন্তানদের মানসিকভাবে যে সহযোগিতা দিতে পারবেন, তা হয়তো অনেক কোটিপতির পক্ষেও সম্ভব হবে না।

বাবার এই কথার মধ্যে সন্তানদের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ছিল। মনির খানের কাছে বাবার অবদান শুধু একটি হারমোনিয়াম কিনে দেওয়া কিংবা সংগীতচর্চার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়া, নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা এবং নিজের লক্ষ্য থেকে সরে না আসার শিক্ষাও তিনি বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন।

বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে একটি গানও গেয়েছেন মনির খান। সেই গানে তাঁদের ওপর চালানো নির্যাতন এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে সংগীতচর্চার পথে বাধা দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি। শিল্পীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গ্রামের চায়ের দোকানে গানটি বাজলে তাঁর বাবা অঝোরে কাঁদতেন।

গানটি তাঁদের পরিবারের কঠিন সময়ের স্মারক হয়ে উঠেছিল। একদিকে ছেলের প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন, অন্যদিকে সেই স্বপ্নের পথে সামাজিক বিরোধ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা—সবকিছুই জড়িয়ে ছিল তাঁদের জীবনের সঙ্গে।

মনির খানের স্মৃতিতে তাই তাঁর বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও ছেলের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। সেই বিশ্বাস ও সমর্থনই সংগীতের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল তাঁকে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।