,

ঢামেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৪২, সেপ্টেম্বরে বেড়েছে রোগী

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৪২ জন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ২ হাজার ১৮১ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। আর ৫৭৯ জন চিকিৎসকদের পরামর্শ শেষ হওয়ার আগেই নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন।

হাসপাতালের তথ্য বলছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু রোগীর চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অক্টোবরের শুরুতেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের এসব নির্ধারিত ওয়ার্ডেই ভর্তি করা হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তাঁদের সঙ্গে থাকা স্বজন ও অ্যাটেনডেন্টের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু রোগীদের মশারি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক রোগী ও তাঁদের সঙ্গে থাকা স্বজন মশারি ব্যবহার করছেন না। ফলে মশার কামড়ের মাধ্যমে রোগী ও অ্যাটেনডেন্টদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

গাজীপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ১৮ বছর বয়সী ফারহান জানান, কয়েক দিন জ্বরে ভোগার পর তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখানে রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যাওয়ায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে আগের তুলনায় কিছুটা ভালো আছেন বলে জানান তিনি।

হাসপাতাল থেকে মশারি দেওয়া হলেও সেটি ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে ফারহান বলেন, মশারি পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ওয়ার্ডে সেটি টানানোর ব্যবস্থা পাচ্ছেন না।

ঢামেকের নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোতে সবার জন্য মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু অনেক রোগী তা ব্যবহার করছেন না। এতে রোগীর পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে থাকা অ্যাটেনডেন্টদেরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ভর্তি

ঢামেকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারিতে ৪৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে মাসে ৭৫ এবং জুনে ১২২ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

এরপর জুলাই থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বরে এসে এক মাসেই সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০৩ জন ডেঙ্গু রোগী ঢামেকে ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২৭ জন। একই সময়ে ৬৬ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং ৩১ জন নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ছেড়েছেন।

অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে ৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে ঢামেকে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ জনে।

জুলাই থেকে বাড়ছে মৃত্যু

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। জানুয়ারিতে দুজন রোগীর মৃত্যু হলেও ফেব্রুয়ারিতে কোনো মৃত্যু হয়নি। মার্চে দুজন এবং এপ্রিলে কেউ মারা যাননি। মে মাসে দুজন ও জুনে একজনের মৃত্যু হয়।

জুলাই ও আগস্টে ডেঙ্গুতে ১০ জন করে মারা যান। সেপ্টেম্বরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ জনে, যা চলতি বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে মোট সাতজনের মৃত্যু হলেও জুলাই থেকে অক্টোবরের প্রথম তিন দিন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৫ জন। এ হিসাবেই বোঝা যায়, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ঢামেকে ডেঙ্গুর চাপ কতটা বেড়েছে।

আগের দুই বছরের তুলনায় মৃত্যু কম

চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঢামেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় কম। ২০২৫ সালে এ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। দুই বছরে মোট মৃত্যু ছিল ২১৩ জন।

তবে বছরের শেষ তিন মাস এখনো বাকি থাকায় চলতি বছরের চূড়ান্ত চিত্র এখনই বলা সম্ভব নয়। আগের দুই বছরের পরিসংখ্যানেও বছরের শেষ দিকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢামেকে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে ২৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪১ জন পুরুষ, ৮৯ জন নারী এবং ৬৮ জন শিশু। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের নির্ধারিত ওয়ার্ডগুলোতেও চাপ বাড়ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে চিকিৎসার পাশাপাশি মশারি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। তাই রোগীর শয্যার চারপাশে মশারি ব্যবহার করা শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় নয়, হাসপাতাল পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের কাছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমকে দেওয়া হয়েছে। তাঁর কাছ থেকেই বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানান পরিচালক।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপপরিচালক ডা. আশরাফুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঢামেকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। সেপ্টেম্বরের এক মাসে ১ হাজার ৪০৩ জন রোগীর ভর্তি এবং অক্টোবরের প্রথম তিন দিনেই ১২৭ জনের ভর্তি হওয়া সেই বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মশারি ব্যবহার এবং মশার সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার বিষয়টিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।