পূর্ব সুন্দরবনের পৃথক এলাকায় মাছ ধরার সময় গত দুই দিনে ২১ জেলেকে বনদস্যুরা অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ শনিবার দিবাগত রাতে ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় ১৫ জেলেকে বিভিন্ন নৌকা থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে একই সময়ে আরও ছয় জেলেকে অপহরণের খবর আসে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় জানান, শনিবার দিবাগত রাতে সাগরসংলগ্ন সুন্দরবনের ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় কয়েকটি জেলে বহর মাছ ধরছিল। এ সময় অজ্ঞাতপরিচয় একদল বনদস্যু জেলেদের বহরে হামলা চালায়। পরে বিভিন্ন নৌকা থেকে একজন করে মোট ১৫ জেলেকে তুলে একটি ট্রলারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
বন বিভাগের ওই কর্মকর্তা জানান, অপহৃত ১৫ জেলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে খুলনার আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০) ও ফেরদাউস (২৮) রয়েছেন। অন্য ছয়জন বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকার বাসিন্দা। তাঁরা হলেন ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮) ও মারুফ (৪৯)।
মিল্টন রায় বলেন, অপহৃত জেলেরা বন বিভাগের অনুমতিপত্র নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরের খাল ও নদীতে মাছ ধরছিলেন। তাঁরা চরপাটা, পোকা জাল ও বড়শি ব্যবহার করে মাছ আহরণ করছিলেন। বৈধ অনুমতি নিয়ে মাছ ধরার সময় তাঁদের অপহরণের অভিযোগে জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এদিকে মোংলার এক জেলে মহাজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শনিবার দিবাগত রাতে বনদস্যু করিম-শরীফ বাহিনীর সদস্যরা সুন্দরবনের ঝাপসি এলাকার ভদ্রা নদী থেকে আরও দুই জেলেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অপহৃত দুজন হলেন মোংলার উলুকাটা চিলা এলাকার মাসুদ ইজারদার (২৮) ও ইমদাদুল ইজারদার (৩০)।
এর আগে একই সময়ে আরও কয়েকজন জেলেকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা মিলিয়ে গত দুই দিনে ২১ জেলে অপহৃত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সব ঘটনার তথ্য এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা বন বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জন্য এমন পরিস্থিতি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাছ আহরণ করতে গিয়ে জেলেদের দীর্ঘ সময় নদী ও খালের প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থান করতে হয়। ফলে কোনো বহরে হামলা বা অপহরণের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সাগরসংলগ্ন দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
শরণখোলা এলাকার কয়েকজন জেলে মহাজন জানান, গত দুই দিনে ২১ জেলে অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁরা অপহৃত জেলেদের দ্রুত উদ্ধারের পাশাপাশি সুন্দরবনে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
তবে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মোংলা এলাকার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সুন্দরবনে জেলে অপহরণের বিষয়ে তাঁরা এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাননি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।
এ অবস্থায় বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছ থেকে ঘটনাগুলোর বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ বা অপহৃত জেলেদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের নিরাপদে উদ্ধারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পরিবার ও জেলে সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।









