জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দেশের দূরপাল্লা ও নগর পরিবহনের বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে নতুন ভাড়া কার্যকর হলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলা শহরের যাত্রীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। একইভাবে দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটেও আগের তুলনায় ভাড়া বাড়বে।
এর আগে সোমবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বাসভাড়া সমন্বয়ের একটি প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকে উভয় ধরনের পরিবহনের ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী ভাড়া ২০ পয়সা বাড়ার কথা থাকলেও জনস্বার্থ বিবেচনায় ৩ পয়সা কম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে হিসাবে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়বে ১৭ পয়সা।
তিনি জানান, বাস মালিকদের বিআরটিএর সঙ্গে বসে নতুন ভাড়ার বিষয়ে সমঝোতা করতে হবে। মহানগর কিংবা জেলা—সব ধরনের রুটেই নির্ধারিত বৃদ্ধির চেয়ে ৩ পয়সা কম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন ভাড়ার বিষয়ে মঙ্গলবারই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলেও তিনি জানান।
ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই কোনো বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন শিমুল বিশ্বাস। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মালিক সমিতি ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবেও বিষয়টি দেখা হবে। ফলে নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারি ও তা কার্যকর হওয়ার সময়ের মধ্যবর্তী সময়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নজরদারির মধ্যে থাকবে।
বাসভাড়া বাড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে সামনে আনা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক লিটার ডিজেলের দাম একবারে ২০ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দামও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। গণপরিবহনের পরিচালন ব্যয়ের বড় একটি অংশ জ্বালানি হওয়ায় ডিজেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি ওঠে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে ব্যয় সমন্বয়ের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
সর্বশেষ ভাড়া সমন্বয়ের আগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল ২ টাকা ৫৩ পয়সা। মিনিবাসের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ২ টাকা ৪২ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল ২ টাকা ২৩ পয়সা।
নতুন ১৭ পয়সা বৃদ্ধির হিসাব অনুযায়ী, ৫২ আসনের দূরপাল্লার বাসের কিলোমিটারপ্রতি মূল ভাড়া ২ টাকা ৪০ পয়সা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বড় বাসে তা দাঁড়াবে ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং মিনিবাসে ২ টাকা ৫৯ পয়সা। তবে এসব হিসাব কেবল কিলোমিটারভিত্তিক মূল ভাড়ার। নির্দিষ্ট কোনো রুটে একজন যাত্রীর মোট ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে রুটের দূরত্ব এবং প্রযোজ্য অন্যান্য চার্জ বিবেচনায় আসবে।
দূরপাল্লার বাসে ভাড়ার হিসাব তুলনামূলক জটিল। সব বাসের আসনসংখ্যা এক নয়। ৫২ আসনের বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে ৪০ বা তার কম আসনের নন-এসি বাসও চলাচল করে। কিছু বাসে আসন কমিয়ে যাত্রীদের জন্য তুলনামূলক বেশি জায়গা রাখা হয়। এ ধরনের বাসে প্রচলিত ভাড়ার সঙ্গে কিলোমিটারভিত্তিক নতুন সমন্বয়ের প্রভাব পড়বে।
এর সঙ্গে বিভিন্ন রুটে সেতু ও সড়কের টোলও যাত্রীর মোট ভাড়ার হিসাবে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধি পেলেও কোনো নির্দিষ্ট রুটে মোট ভাড়া ঠিক কত টাকা বাড়বে, তা শুধু এই হার দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট রুটের দূরত্ব, বাসের ধরন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গণপরিবহনের বাইরেও পড়তে পারে। বাসের পরিচালন ব্যয় বাড়লে পরিবহন খাতের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পণ্য সরবরাহ ও বাজারদরের ওপর কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তনের মাত্রা এবং অন্যান্য বাজার পরিস্থিতির ওপর।
অন্যদিকে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নতুন ভাড়া বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হয়। কিলোমিটারভিত্তিক নির্ধারিত ভাড়া ও রুটভিত্তিক মোট ভাড়ার মধ্যে যেন অসামঞ্জস্য না থাকে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নজরদারির বিষয় হয়ে উঠবে।
নতুন ভাড়ার হার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর হওয়ার আগে কোনো পরিবহন মালিক বা শ্রমিকের ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগ থাকার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবহন মালিক সমিতির তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সিদ্ধান্তটি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, এখন সেটিই বড় বিষয়।









