ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একের পর এক বাধার কারণে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। বিশ্বের কয়েকটি বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ থেকে রপ্তানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আগামী মাসগুলোতে ডিজেলের দাম নতুন করে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এরই মধ্যে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। ইউরোপে ডিজেল ফিউচারের দাম গত সপ্তাহে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের শুরুতে যে দামে ডিজেল ফিউচার লেনদেন হচ্ছিল, তার তুলনায় বর্তমান মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে লোহিত সাগর অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ ডিজেল এই সমুদ্রপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়। ফলে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ নয়, ইউরোপসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এসব শোধনাগারের উৎপাদন কমেছে এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের পরিশোধনাগারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও সব শোধনাগারের সক্ষমতা সীমিত।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো গত আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় উৎপাদন বাড়াতে শোধনাগারগুলো ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কাজ করছে।
সোমবার প্রকাশিত এক নিউজলেটারে আইইএ জানায়, বিশ্বের অনেক শোধনাগার এখন তাদের সক্ষমতার প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে গেলে অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করার সুযোগ সীমিত থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য আরও নাজুক হয়ে পড়তে পারে।
পণ্যবাজারের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্যেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে ডিজেল রপ্তানি কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত অঞ্চলটি থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
ইউরোপের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপের মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ৪১ শতাংশ এসেছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চল থেকে রপ্তানি কমে গেলে ইউরোপকে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হয়, যা পরিবহন ব্যয় ও বাজারদর—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়াতে পারে।
কেপলারের বিশ্লেষক জর্জ শ বলেন, লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে কোনো ধরনের বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে থাকা বৈশ্বিক ডিজেল বাজারে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমানে শোধনাগারের সক্ষমতাই বৈশ্বিক ডিজেল বাজারের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ার শোধনাগারে হামলায় সরবরাহে চাপ
ডিজেলের বৈশ্বিক সরবরাহে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ তৈরি হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে ঘিরে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পর মস্কো গত জুলাইয়ে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া থেকে আসা সরবরাহও কমে যায়।
রাশিয়া বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর একটি হওয়ায় দেশটির শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। তবে এরপরও দুই দেশ একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রোববার জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেই বৈঠকে যুদ্ধ এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
বিশ্ববাজারে ডিজেলের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু উৎপাদন বা চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না। যুদ্ধের কারণে শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, রপ্তানি কমে যাওয়া, সমুদ্রপথে পরিবহন ঝুঁকি এবং শোধনাগারগুলোর সীমিত অতিরিক্ত সক্ষমতা—সব মিলিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব চাপের কোনোটি আরও বাড়লে ডিজেলের আন্তর্জাতিক দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।









