,

শুভ জন্মদিন, বিশ্বজয়ী অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন

“তোমার কথা বলা যেন মধুবালা,
হাঁটাচলা সোফিয়া লরেন”—অঞ্জন দত্তের গানের এই পঙ্‌ক্তিতে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি নামের অনন্য সংযোগ তৈরি হয়েছে। সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়প্রতিভার সমন্বয়ে যিনি কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন, সেই ইতালীয় অভিনেত্রী সোফিয়া লরেনের আজ জন্মদিন।

১৯৩৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ইতালির রোমে জন্মগ্রহণ করেন সোফিয়া লরেন। তাঁর শৈশব কাটে নেপলসের কাছের পোজুয়োলিতে। জীবনের শুরুর সময়টা ছিল সহজ নয়। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটিই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবন তাই শুধু তারকাখ্যাতির গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার এক দীর্ঘ যাত্রা।

কৈশোরে বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বিনোদনজগতে তাঁর প্রবেশ ঘটে। সে সময় চলচ্চিত্র প্রযোজক কার্লো পন্টির নজরে পড়েন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয়ের সুযোগ বাড়তে থাকে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ছোট চরিত্রে কাজ করলেও তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং পর্দায় আলাদা আকর্ষণ খুব দ্রুত দর্শক ও নির্মাতাদের নজর কাড়ে।

সোফিয়া লরেনের জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর সৌন্দর্যের পাশাপাশি অভিনয়ক্ষমতাও ছিল বড় শক্তি। আবেগ, বেদনা, হাস্যরস কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রকে তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় তুলে ধরতে পারতেন। ইতালীয় চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।

‘বয় অন এ ডলফিন’ এবং ‘দ্য প্রাইড অ্যান্ড দ্য প্যাশন’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। হলিউডের একাধিক খ্যাতিমান অভিনেতার সঙ্গে কাজ করে তিনি প্রমাণ করেন, তাঁর অভিনয় প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা চলচ্চিত্রশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি হয়ে আছে ১৯৬০ সালের ‘টু উইমেন’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে যুদ্ধ, মাতৃত্ব, বেঁচে থাকার লড়াই এবং মানবিক যন্ত্রণার গভীরতা তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেন। এই অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬২ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে একাডেমি পুরস্কার পান। বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার অর্জনকারী প্রথম অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর নাম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সোফিয়া লরেনের ক্যারিয়ারে ইতালীয় অভিনেতা মারচেলো মাস্ত্রোইয়ানির সঙ্গে জুটিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘ম্যারেজ ইটালিয়ান স্টাইল’ ও ‘সানফ্লাওয়ার’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁদের অভিনয় দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। পর্দায় তাঁদের স্বাভাবিক রসায়ন এবং অভিনয়ের সামঞ্জস্য ইতালীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় জুটি হিসেবে তাঁদের প্রতিষ্ঠিত করে।

ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ে ক্লার্ক গেবল, ক্যারি গ্রান্ট, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, পিটার সেলার্স, চার্লটন হেস্টন, পল নিউম্যান, গ্রেগরি পেক ও মার্লন ব্র্যান্ডোর মতো তারকাদের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন সোফিয়া লরেন। কিংবদন্তি নির্মাতা চার্লি চ্যাপলিন পরিচালিত ‘আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং’ চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখা যায়।

ব্যক্তিজীবনেও কার্লো পন্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৫৭ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই সন্তান—কার্লো পন্টি জুনিয়র ও এদোয়ার্দো পন্টি। পরিবার ও মাতৃত্বের পাশাপাশি দীর্ঘ অভিনয়জীবন সামলেছেন তিনি। তাঁর ছোট ছেলে এদোয়ার্দো পন্টি পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন।

সোফিয়া লরেনের জীবন ও কর্ম নিয়ে ১৯৮০ সালে নির্মিত হয় টেলিভিশন চলচ্চিত্র ‘সোফিয়া লরেন: হার ওন স্টোরি’। অভিনয় থেকে কিছুটা বিরতির পরও তিনি পুরোপুরি হারিয়ে যাননি। ১৯৯৪ সালে ‘প্রেট-আ-পোর্তে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় আবারও আলোচনায় আসেন। ২০০২ সালে ছেলে এদোয়ার্দো পন্টির পরিচালনায় ‘বিটুইন স্ট্রেঞ্জারস’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। পরে ২০০৯ সালের ‘নাইন’ চলচ্চিত্রেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন সোফিয়া লরেন। ১৯৯১ সালে তিনি সম্মানসূচক একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। এই স্বীকৃতি তাঁর কয়েক দশকের চলচ্চিত্রজীবনের আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।

তাঁর সাফল্যের গল্পে শুধু রুপালি পর্দার চাকচিক্য নেই। রয়েছে কঠিন শৈশব, সীমিত সুযোগ, পরিশ্রম এবং নিজের প্রতিভার ওপর আস্থা রাখার ইতিহাস। সেই কারণেই সোফিয়া লরেনের নাম কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রীর পরিচয় বহন করে না; তিনি হয়ে উঠেছেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের প্রতীক।

আজও তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর পর্দার উপস্থিতি, চরিত্র নির্বাচনের বৈচিত্র্য এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ার নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাঁকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভাষা ও দর্শকের রুচি বদলেছে, কিন্তু তাঁর কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়ে গেছে।

সোফিয়া লরেন তাই শুধু ইতালীয় সিনেমার তারকা নন, বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক স্মরণীয় শিল্পী। সৌন্দর্যের পাশাপাশি অভিনয়কে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত করে তিনি যে অবস্থান তৈরি করেছেন, তা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।

জন্মদিনে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের সৃষ্টিগুলো চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে আরও বহু বছর স্মরণীয় হয়ে থাকুক।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।