দেশের বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনিয়ম, গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা কাটাতে আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বীমা আইন, ২০১০ সংশোধনের পাশাপাশি সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নতুন সংকট-সমাধান কাঠামো তৈরির কাজ চলছে।
সংশোধিত আইন ও প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়গুলো আরও কঠোরভাবে তদারকির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এসব তথ্য জানান।
সরকারের এই উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের বীমা খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। গ্রাহকদের দাবি দীর্ঘদিন আটকে থাকা, কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব সমস্যা সমাধানে শুধু আইন সংশোধন নয়, প্রয়োজন হলে সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে সরকার।
আমির খসরু বলেন, বীমা খাত সংস্কারের পথে আইনি জটিলতাও একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠান বারবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে এমন সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, যার কারণে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ বিলম্বিত হয়েছে।
এ ছাড়া কয়েকটি বীমা কোম্পানি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান মন্ত্রী।
দুর্বল কোম্পানি নিয়ে অনিশ্চয়তা
দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করা হবে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
তিনি বলেন, সংকট-সমাধানের কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগে কোম্পানি একীভূত করার বিষয়ে মন্তব্য করা আগেভাগে হয়ে যাবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অর্থাৎ, সরকার আপাতত সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে চাইছে। প্রস্তাবিত আইনে কোম্পানি পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
জীবনবীমার ৫৭ শতাংশ দাবি বকেয়া
বীমা খাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করা। আমির খসরু জানান, দেশের জীবনবীমার ৫৭ শতাংশ দাবি এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এর ফলে বিপুলসংখ্যক পলিসিধারী তাদের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বীমা খাতে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে বলে জানান তিনি। যেসব কোম্পানি গ্রাহকদের পাওনা আটকে রাখছে, তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু বীমা প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ পর্যাপ্ত নগদ তারল্য হিসেবে না রেখে জমি, রিয়েল এস্টেট ও সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেছে। ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের সময় প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বীমা মানুষের জীবন, সম্পদ ও বিভিন্ন আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের বীমা খাত সেই সম্ভাবনা অনুযায়ী বিকশিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন আমির খসরু।
দাবি পরিশোধে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বকেয়া দাবি পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
কোনো কোম্পানি নগদ অর্থের সংকটের কারণে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করতে না পারলে প্রয়োজনে জমি ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন মন্ত্রী।
দ্বৈত সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ
বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য সংরক্ষণ ও লেনদেন ব্যবস্থাতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আমির খসরুর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুটি পৃথক রেকর্ড ব্যবস্থা বা সার্ভার পরিচালনা করছিল। এর একটি ছিল আনুষ্ঠানিক, অন্যটি গোপন।
এই ধরনের ব্যবস্থা অননুমোদিত লেনদেনের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বীমা কোম্পানিগুলোর এ ধরনের দ্বৈত সার্ভার ব্যবহারের অনুমতি নেই।
নির্ধারিত সময়ের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শন ও যাচাই কার্যক্রম চালানো হবে। নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
মন্ত্রী বলেন, ৭ থেকে ৮টি বীমা কোম্পানি বারবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান এখন বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
আইডিআরের জনবল কাঠামোতেও পরিবর্তন
শুধু বীমা কোম্পানিগুলো নয়, খাতটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমির খসরু বলেন, আইডিআরে স্থায়ী ও বিশেষায়িত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সংস্থাটি অনেক ক্ষেত্রে কমিশনার ও প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল।
প্রেষণে আসা কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট সময় দায়িত্ব পালনের পর নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে যান। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা কাটাতে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আইডিআরের প্রেষণনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এর পরিবর্তে স্থায়ী ও পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের জন্য সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তার মতে, অর্থনীতিতে বীমা খাতের গুরুত্ব থাকলেও ধারাবাহিকভাবে এই খাতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আগের সরকারগুলো যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
প্রস্তাবিত আইন সংশোধনের মাধ্যমে বীমা কোম্পানির পুনর্গঠনের বিধান যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে আইডিআরের তদারকি ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনায় তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বীমা খাতের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার বিষয়টিও রয়েছে। গ্রাহকদের দাবি দ্রুত পরিশোধ, কোম্পানির আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কার্যকর করাই সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
আইন সংশোধনের পাশাপাশি সংকট-সমাধান কাঠামো বাস্তবায়ন করা গেলে সমস্যাগ্রস্ত বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানো এবং দেশের বীমা খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার পথও তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।









