নিজস্ব প্রতিবেদক:
একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। পদ সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার। গ্রেড-৯।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর চার বছরের বেশি সময় ধরে কর্মস্থল ঢাকার প্রধান কার্যালয়। অথচ এই সময়ের মধ্যেই চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, দুবাই, ইস্তাম্বুল ও সিঙ্গাপুরসহ আটটি বিদেশ সফরের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
শুধু বিদেশ সফর নয়, অভিযোগ উঠেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখায় তার দীর্ঘদিনের অবস্থান, মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন, বদলি সংক্রান্ত কাজ এবং কোটি কোটি টাকার ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার নিয়েও।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন শাখায় কর্মরত সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার জোনায়েদ সিদ্দিক।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ আবার সরকারি অডিটের নথির সঙ্গেও সম্পর্কিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একটি ইভেন্টে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা সরকারি আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে আপত্তি জানিয়েছে পিটিএসটি অডিট অধিদপ্তর।
তবে অডিট আপত্তিতে জোনায়েদ সিদ্দিকের নাম সরাসরি উল্লেখ আছে কি না এবং তার ব্যক্তিগত দায় নির্ধারিত হয়েছে কি না, সেটি আলাদাভাবে দেখা জরুরি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্য অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে অভিযোগপত্রে উত্থাপিত দাবি এবং এগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
অডিটে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার আপত্তি
পিটিএসটি অডিট অধিদপ্তরের ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের অডিট মেমো নং-১৩-এ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একটি ইভেন্ট ব্যয়ের বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ২৬তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের ভৌত সেবা সরবরাহের জন্য Conference & Exhibition Management Services Limited বা CEMS-এর সঙ্গে ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ৫৪ লাখ ৮১ হাজার ৫৫০ টাকার চুক্তি হয়।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি বিল দাখিল করে এবং ২২ জুন ২০২৫ তারিখের ভাউচারে মোট ৫০ লাখ ১৪ হাজার ৫৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়।
অডিটে দেখা যায়, এই অর্থের মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ছিল ‘Miscellaneous and Incidental Cost’ খাতে। অডিট আপত্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই খাতে অর্থ ব্যয়ের আগে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই ব্যয়ের পক্ষে কোনো নির্দেশনার দলিল বা সেবা প্রদানের প্রমাণক পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু টাকার অঙ্ক নিয়ে নয়। সরকারি অর্থ কোন প্রক্রিয়ায় ব্যয় হলো এবং ব্যয়ের অনুমোদন ও প্রমাণক যথাযথ ছিল কি না, সেটিই অডিটের মূল আপত্তি।

জোনায়েদ সিদ্দিক ২০২২ সালে সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রায় ৬৪ জনের সঙ্গে চাকরিতে যোগ দেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। অথচ অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রামে প্রশাসন শাখায় সহকারী নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার পদটির সংস্থান নেই।
তারপরও চার বছরের বেশি সময় ধরে তিনি প্রশাসন শাখায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা পিএসের দায়িত্ব, কর্মকর্তাদের বদলি সংক্রান্ত কাজ, বৈদেশিক ভ্রমণ সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ইভেন্টের টেন্ডার ও আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে তার বৈদেশিক সফর নিয়ে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, অধিদপ্তরে তার চেয়ে উচ্চতর গ্রেডে কর্মরত অন্তত ৭০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের অনেকেই বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বা সফরের সুযোগ একবারও পাননি বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে জোনায়েদ সিদ্দিক চার বছরের মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, দুবাই, ইস্তাম্বুল ও সিঙ্গাপুরসহ মোট আটটি বিদেশ সফর করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই সফরগুলোর সরকারি অনুমোদন বা জিও এবং ভ্রমণ বিলের নথি অভিযোগকারীর কাছে থাকার দাবি করা হয়েছে। এসব নথি যাচাই করে প্রতিটি সফরের উদ্দেশ্য, অর্থের উৎস এবং সরকারি অনুমোদনের ধরন খতিয়ে দেখা গেলে অভিযোগটির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কীভাবে
অভিযোগপত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি তোলা হয়েছে তা হলো একজন গ্রেড-৯ নন-ক্যাডার কর্মকর্তা কীভাবে অর্গানোগ্রামের বাইরে থাকা একটি শাখায় বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মহাপরিচালকের পিএসের দায়িত্বও পালন করেছেন। ফলে বদলি, পদায়ন, ডিডিও দায়িত্ব প্রদান, গাড়ি সুবিধা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব তৈরি হয়।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, জেলা পর্যায়ে আইসিটি অফিসারের পদ শূন্য থাকলে নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও জোনায়েদ সিদ্দিক জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওই দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে ফাইল নোট উপস্থাপন করেছেন।
অর্থের বিনিময়ে এমন দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ফাইল নোট, দায়িত্ব প্রদানের আদেশ এবং মাঠ পর্যায়ের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ইভেন্টের কোটি কোটি টাকার কাজ
জোনায়েদ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর আরেকটি অংশ ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা ঘিরে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ইভেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কাজ না করেও বিল দেওয়া এবং কম কাজকে বেশি দেখানোর মতো অনিয়ম করা হয়েছে।
এমনকি এসব কর্মকাণ্ডের কারণে অডিট অধিদপ্তর একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে স্পষ্ট করা দরকার। বর্তমানে হাতে থাকা অডিট মেমোর যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ২৬তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডের একটি ইভেন্টে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতির আপত্তি স্পষ্টভাবে রয়েছে। অন্য অডিট আপত্তিগুলোর সঙ্গে জোনায়েদ সিদ্দিকের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পোস্টিং বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, মহাপরিচালকের পিএস ও প্রশাসন শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগ নিয়ে জোনায়েদ সিদ্দিক অর্থের বিনিময়ে পোস্টিং, অনিয়মিতভাবে ডিডিও দায়িত্ব প্রদান এবং গাড়ি সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
মাঠ পর্যায় থেকে এসব বিষয়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও প্রশাসন শাখায় তার প্রভাবের কারণে সেগুলো গায়েব বা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি সত্যিই একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে থাকে, সেগুলোর পরিণতি কী হয়েছিল, কোন কর্মকর্তা সেগুলো নিষ্পত্তি করেছিলেন এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, তা নথি পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।
তদন্ত হলেই মিলবে উত্তর
একজন গ্রেড-৯ কর্মকর্তার চার বছরের বেশি সময় ধরে প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান, অর্গানোগ্রামের বাইরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, মহাপরিচালকের পিএস হিসেবে কাজ করা এবং একই সময়ে একাধিক বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়া—এই বিষয়গুলোই এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় আর্থিক অনিয়ম, পোস্টিং ও ডিডিও দায়িত্ব প্রদান এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ।
সব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে অডিটের নথিতে একটি আর্থিক অনিয়মের আপত্তি থাকা এবং একই কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো প্রশাসনিক অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষ করে তার চার বছরের বিদেশ সফরের সম্পূর্ণ তালিকা, প্রতিটি সফরের সরকারি জিও, ব্যয়ের উৎস, সফরের উদ্দেশ্য, প্রশাসন শাখায় দায়িত্ব পালনের অনুমোদন, বদলি ও ডিডিও সংক্রান্ত ফাইল এবং ইভেন্টের টেন্ডার ও বিল ভাউচার পর্যালোচনা করা গেলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি বেরিয়ে আসতে পারে।









