দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি, নিয়মিত কর্মসূচিতে ব্যাঘাত এবং বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকার বাইরে থেকে যাওয়ার প্রভাব এবার ভয়াবহ আকারে সামনে এসেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৯ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে ১ হাজার ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম বা হামসদৃশ সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর বৈশ্বিক হাম পরিস্থিতির তালিকাতেও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৫৭ হাজার ৫৬১টি হাম সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছিল, যা ওই সময়ের হিসাবে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
তবে মৃত্যুর হিসাবের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে ১ হাজার ২ জনের মৃত্যুর মধ্যে ১০০ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছিল। বাকি ৯০২ জনের মৃত্যু হামসদৃশ উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু হিসেবে তালিকাভুক্ত। অর্থাৎ সব মৃত্যুকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু বলা যাচ্ছে না। একইভাবে মোট আক্রান্তের হিসাবেও নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন রোগী—দুই শ্রেণিই রয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৯০৪। এর বাইরে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০। বিপুল এই সংখ্যা প্রাদুর্ভাবের বিস্তার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়।
হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ
হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন। ওই সময়ও ৫ হাজার ৫৭৪ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ হাম নিজে একটি সংক্রামক রোগ হলেও এর সঙ্গে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সহায়ক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
টিকাদানে ঘাটতি কেন এত বড় ঝুঁকি তৈরি করল
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকার সুরক্ষা কমে গেলে ভাইরাস খুব দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিভিন্ন কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে অনেক শিশু হাম-রুবেলার টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপ্রিলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। দুই বছরের কম বয়সী শিশু এবং যারা টিকা নেয়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি ছিল আরও বেশি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যেও টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়টি সামনে এসেছে। টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তনের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন সংসদে জানিয়েছেন। ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
টিকাদানের ক্ষেত্রে একটি মৌসুমি বা এককালীন অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা না পেলে তাকে পরে শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হয়। এই ‘বাদ পড়া’ শিশুদের সংখ্যা যদি কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকে, একপর্যায়ে একটি বড় জনগোষ্ঠী হাম ভাইরাসের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া থেকে যায়। তখন ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও বেড়ে যায়।
জরুরি টিকাদানেও পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালায়। জুনের শেষ নাগাদ এই কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই অগ্রগতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু জরুরি কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও নতুন রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ হয়নি। এর অন্যতম কারণ, আগের সময়ের টিকাদান ঘাটতির ফলে অনেক শিশু ইতিমধ্যেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে ছিল। আবার একটি টিকা কর্মসূচির পরিসংখ্যানের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় বাস্তবে কত শিশু সুরক্ষিত হয়েছে, তার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞদের কাছে এখন শুধু জরুরি টিকাদান অভিযান শেষ করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদানের কাঠামোকে কার্যকর রাখা, টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কোনো কারণে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছোট শিশুরা
হামের শুরুতে সাধারণত জ্বর, কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও গুরুতর সংক্রমণে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অল্প বয়সী শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। এ কারণেই বর্তমান প্রাদুর্ভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় অংশ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো টিকাদান। কোনো এলাকায় টিকার আওতা কমে গেলে শুধু টিকা না পাওয়া শিশুই নয়, পুরো সম্প্রদায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে খুব ছোট শিশু, যারা বয়সের কারণে সব টিকা নেওয়ার সুযোগ পায়নি, তাদের সুরক্ষার জন্য আশপাশের মানুষের টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ।
পুরোনো অর্জন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে
হাম নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে রোগটির বিস্তার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে, টিকাদানের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হলে আগের অর্জনও দ্রুত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই একদিকে আক্রান্তদের শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া, অন্যদিকে টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা—দুই কাজই একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে। মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো, টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ওপর কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই বাংলাদেশে হাম সংক্রমণের জাতীয় ঝুঁকি উচ্চ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এখন এক হাজারের বেশি সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু এবং প্রায় দুই লাখ হাম ও হামসদৃশ সংক্রমণের হিসাব পরিস্থিতির মাত্রা আরও স্পষ্ট করেছে।
একসময় নিয়ন্ত্রণে আসা হাম আবার বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ফিরে এসেছে। এই প্রাদুর্ভাব সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি কোথায় তৈরি হচ্ছে, কেন শিশু বাদ পড়ছে এবং টিকা সরবরাহে কোথায় সমস্যা হচ্ছে—এসব প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।









