,

বিশ্ববাজারে কমল স্বর্ণের দাম

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি মাসে সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে কিছুটা পতন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ফেডের পরবর্তী মুদ্রানীতির দিকনির্দেশনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট স্বর্ণের দাম দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪২১ দশমিক ০৪ ডলারে নেমে আসে। ডিসেম্বর সরবরাহের জন্য মার্কিন স্বর্ণের ভবিষ্যৎ চুক্তির দামও দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯০ ডলারে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ছুটি থাকায় সেদিন বাজারে লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দামের সাম্প্রতিক ওঠানামার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে পরিবর্তিত প্রত্যাশা। শুক্রবার প্রকাশিত কর্মসংস্থানসংক্রান্ত শক্তিশালী তথ্যের পর মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়েছে। এর ফলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের ওপর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমেছে।

স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্যবিষয়ক কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, শক্তিশালী কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পর বাজারে ১৬ সেপ্টেম্বরের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ফেড সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। এর প্রভাব স্বর্ণ ও রুপার বাজারে পড়েছে। জ্বালানি পণ্যের দামের গতিপথের সঙ্গে মূল্যবান ধাতুগুলোর সাম্প্রতিক গতিবিধিতেও কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

হ্যানসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সোমবার লেনদেনের একপর্যায়ে স্বর্ণের দাম দুইবার প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৪০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। তবে ওই পর্যায়ে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়। বাজারে প্রায় ৪ হাজার ৩২০ ডলারের স্তরকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিপরীতে, দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে উঠলে নতুন করে বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে আগস্টে দেশটিতে চাকরি বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। শ্রমবাজারের এই দৃঢ়তা ফেডের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন এনেছে।

ফেডের নীতিনির্ধারণী বৈঠক ঘিরে বাজারের প্রত্যাশারও পরিবর্তন হয়েছে। সিএমই ফেডওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের বৈঠকে ফেড সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন সম্ভাবনা ব্যবসায়ীরা ৫৮ শতাংশ হিসেবে দেখছেন। কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এই সম্ভাবনা ছিল ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, নতুন শ্রমবাজারের তথ্য প্রকাশের পর সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

এখন বিনিয়োগকারীদের প্রধান নজর যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে। বৃহস্পতিবার উৎপাদক মূল্যসূচক এবং শুক্রবার ভোক্তা মূল্যসূচক প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। উৎপাদন পর্যায় ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য পরিবর্তনের এই দুই সূচক ফেডের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হলে সুদের হার নিয়ে কঠোর অবস্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে নীতিগত অবস্থান শিথিল হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।

এদিকে সপ্তাহান্তে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল এবং হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথের মানচিত্র ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে। এসব ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রভাব বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হিসাবেও পড়তে পারে বলে বাজারে আশঙ্কা রয়েছে।

স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। তবে এর বিপরীতে সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের আকর্ষণ কমতে পারে। কারণ স্বর্ণ কোনো সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না। ফলে বন্ড বা সুদভিত্তিক অন্যান্য সম্পদ থেকে যখন তুলনামূলক বেশি আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তখন কিছু বিনিয়োগকারী স্বর্ণ থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার আবারও ফেডের সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, ফেড যদি সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন। তাঁর এই মন্তব্যও বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। সোমবার স্পট রুপার দাম দশমিক ২ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬৬ দশমিক ০৬ ডলারে নেমেছে। তবে প্লাটিনামের দাম দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮২৫ দশমিক ২১ ডলারে উঠেছে। প্যালাডিয়ামের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ, ফলে প্রতি আউন্সের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০১ দশমিক ৮৪ ডলার।

সব মিলিয়ে, স্বর্ণের পরবর্তী দামের গতিপথ নির্ধারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য, ফেডের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ইঙ্গিত মিললে স্বর্ণের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা নীতিগত অবস্থান শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আবারও বাড়তে পারে।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।