বাংলাদেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, শোকজ, বহিষ্কার, বেতন বন্ধ, পদোন্নতি আটকে দেওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের একাংশের দাবি, একটি অনলাইন সংবাদে প্রকাশিত তালিকা ও তার ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত কমিটিকে কেন্দ্র করে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও একাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শিক্ষক প্রতিনিধিত্ব ও প্রশাসনিক নির্বাচনের দীর্ঘদিনের চর্চা রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ফলে শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান থাকা এবং কোনো নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই—এমন মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, বেতন বন্ধ, সাময়িক বরখাস্ত, প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা এবং অন্যান্য হয়রানির অভিযোগ সামনে আসে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন নির্দেশনা ও দাপ্তরিক আদেশ জারি করে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো শিক্ষকদের পুনর্বহাল, স্থগিত বেতন ও আর্থিক সুবিধা চালু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৪ আগস্ট ২০২৬ ‘এশিয়া পোস্ট’ নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের অন্যতম ভিত্তি ছিল একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে থাকা শিক্ষকদের নামের তালিকা। তবে তালিকায় থাকা কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, ওই গ্রুপ সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই এবং সেখানে তাঁরা কোনো পোস্ট বা কার্যক্রমে অংশ নেননি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁদের কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের মানসিক চাপ ও প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা তথ্য-অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের আওতায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী মোহাম্মদ নাফিজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু সংবাদে প্রকাশিত তালিকায় নাম থাকার কারণেই নয়, অতীতে নির্দিষ্ট শিক্ষক প্যানেলকে সমর্থন বা কোনো প্রশাসনিক নির্বাচনে অবস্থান নেওয়ার কারণেও কয়েকজন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তের আগেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভিযোগ
শিক্ষকদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোথাও কোথাও প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল ওদুদ, অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ড. মোবারক হোসেনের বেতন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতি ও উচ্চতর পদে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া এবং বিভাগীয় বা পাঠদান কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরীসহ ১১ জন শিক্ষক গুরুতর শারীরিক চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের কক্ষে একদল লোক ঢুকে ভাঙচুর ও তাঁকে হেনস্তা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিভাগের যোগ্য শিক্ষকদের বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট একজন ডিনকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার এবং এর প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা তদন্ত কমিটি গঠনের অভিযোগও উঠেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার, সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগর, সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন ও অধ্যাপক সালমা খাতুনকে বহিষ্কারের তথ্যও অভিযোগের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের সময় শিক্ষকদের মানসিকভাবে পীড়াদায়ক প্রশ্ন করা এবং শোকজ নোটিশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য এবং তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো শিক্ষককে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক মতাদর্শ বনাম অপরাধ
আইনজীবী ও শিক্ষাবিদদের আলোচনায় বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করা। কোনো শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন বা অতীতে কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা শিক্ষক প্যানেলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন—এটিই অপরাধের প্রমাণ নয়। অন্যদিকে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকলে প্রচলিত আইনে যথাযথ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর রহমান বিষয়টিকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সংবাদ প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা বা তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের তকমা দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো গুরুতর কোনো অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা আদালতের বিকল্প হয়ে এমন অপরাধের বিচার করতে পারে না বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
সাংবিধানিক অধিকার ও একাডেমিক স্বাধীনতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতেও মতপ্রকাশ ও শিক্ষার অধিকার সুরক্ষিত। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২৬ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার উল্লেখ রয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় একাডেমিক স্বাধীনতার বিষয়টিও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেস্কোর ১৯৯৭ সালের উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষক-কর্মীদের মর্যাদা সম্পর্কিত সুপারিশমালায় শিক্ষকদের একাডেমিক ও পেশাগত স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং ন্যায্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের ভিত্তিতে ব্যাপক তদন্ত ও হয়রানির অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দক্ষ শিক্ষক ও গবেষকদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান। সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে নির্দিষ্ট অপরাধকে এক করে দেখলে একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে কোনো শিক্ষক যদি সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের মুখোমুখি হন, তাহলে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। তদন্তের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য উদ্ঘাটন, কাউকে হয়রানি বা পূর্বনির্ধারিতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা নয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান অভিযোগ ও তদন্তের ক্ষেত্রে তাই যথাযথ আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি এবং ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত শিক্ষকদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন না করা এবং শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিরাপদ ও স্থিতিশীল শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।









