বাংলা গানের বিশাল ক্যানভাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের সৃষ্টি কাল অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে। সেই গানগুলো মানুষ পুজোয়-পার্বণে গায়, শুনে আবেগাপ্লুত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়। তবে সুরের মোহে আচ্ছন্ন শ্রোতারা অনেক সময়ই ভুলে যান সেই কালজয়ী কথাগুলোর জন্মদাতার নাম। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের জগতকে অসাধারণ সব কথা দিয়ে সমৃদ্ধ করা তেমনই এক বিস্মৃত কিন্তু অনন্য প্রতিভাধর কবি ও গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৩২ সালের ২৭ ডিসেম্বর খুলনা শহরে জন্ম নেন এই মহান শিল্পী। পিতা শচীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা রাধারাণী দেবী ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক সাহসী নারী। খুলনায় শৈশবের পাঠ শুরু হলেও ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। দেশভাগের করুণ পরিণতি ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তাণ্ডবে ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে শরণার্থী হয়ে তাকে চলে আসতে হয় কলকাতায়। দক্ষিণ কলকাতায় দিদি, প্রাবম্ভিক ও চিত্রগ্রাহক শিবানী চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে আশ্রয় জোটে তাদের। শত প্রতিকূলতার মাঝেও পড়াশোনা থামাননি তিনি; আশুতোষ কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে খানপুর স্কুলে সামান্য বেতনের শিক্ষকতায় যোগ দেন।
জীবিকার তাগিদ থাকলেও তার হৃদয়ের গভীরে তখন কাব্যরস বাসা বেঁধেছিল। দিদির অনুপ্রেরণায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন শিবদাস। দেশ, বসুমতী এবং আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’ বিভাগে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে তার লেখা। চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের উত্তাল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন তার চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে সুরকার অপরেশ লাহিড়ীর আহ্বানে ‘ক্রান্তি শিল্পী সংঘ’-এর জন্য গান লিখতে শুরু করেন। এর কিছুদিন পর এক সাহিত্যসভায় প্রখ্যাত কবি ও চলচ্চিত্রকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যার সুবাদে তিনি আকাশবাণীর তালিকাভুক্ত গীতিকার হওয়ার সুযোগ পান।
এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। উপ মহাদেশের একের পর এক কিংবদন্তি শিল্পী তার লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, মান্না দে, ভূপেন হাজারিকা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, রুনা লায়লা, রুমা গুহঠাকুরতা, ইলা বসু কিংবা অংশুমান রায়ের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে তার সৃষ্টিগুলো অমরতা লাভ করে। ‘আমি এক যাযাবর’, ‘মানুষ মানুষের জন্য’, ‘দোলা হে দোলা’, ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’ কিংবা ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল’-এর মতো গানগুলো আজও বাংলা গানের অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর সহমর্মিতা থেকে তিনি লিখেছিলেন ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’। ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে এই গানটি দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরন্তন স্থান করে নেয়।
অসামান্য জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তার যোগ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পাননি। গানের সুরকার বা শিল্পীর নাম মুখে মুখে ঘুরলেও অন্তরালেই থেকে গিয়েছিলেন এই শব্দ কারিগর। এমনকি ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ গানটির অসমীয়া রূপান্তরের ক্ষেত্রেও মূল রচয়িতা হিসেবে তাকে সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি বলে আক্ষেপ থেকে যায়। জীবনের শেষভাগে এসে চরম আর্থিক অনটন ও দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে এই মহান কবিকে। ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট নীরবে প্রদীপ নেভে এই গুণী শিল্পীর। পরে কলকাতা পুরসভার উদ্যোগে ১১২ নম্বর ওয়ার্ডে তার একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হলেও, বঞ্চনার ইতিহাসের কাছে তা ছিল খুবই সামান্য। তবে বাহ্যিক স্বীকৃতি যাই থাকুক না কেন, যে মানুষের কথায় মানবতা ও জীবনবোধের এমন গভীর সুর বাজে, তিনি তার সৃষ্টির মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
মন্তব্য