খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪৫ পিএম

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের বাণিজ্য সুবিধা পাবে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সিইপিএ-সংক্রান্ত আলোচনা সমাপ্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চুক্তিটির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমঝোতার পর্যায়ে পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই সরকার দেশের প্রথম সিইপিএ স্বাক্ষরের পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ হতে পারে। শুল্ক সুবিধা কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন। এর ফলে বিদ্যমান ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।
তবে শুধু শুল্ক কমে গেলেই রপ্তানি বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। চুক্তির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পণ্যের উৎপত্তি-সংক্রান্ত নিয়ম, মান নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক কাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদেরও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, পণ্যের গুণগত মান উন্নত করা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যে বৈচিত্র্য আনার দিকে জোর দিতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি নতুন খাতের সম্ভাবনাও কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে সিইপিএকে কাজে লাগিয়ে চামড়া, পাট, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের রপ্তানি ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক এবং বিভিন্ন ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। এসব পণ্যের আমদানি সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হলে দেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, উপকরণ ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ আরও কার্যকর হতে পারে। এতে কিছু শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিইপিএর সম্ভাব্য প্রভাবকে সংক্ষেপে এভাবে দেখা যায়—
| বিষয় | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|
| দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য | প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবায় অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার সুযোগ |
| বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য | প্রায় ৮৭ শতাংশ পণ্যে অনুরূপ বাণিজ্য সুবিধার সম্ভাবনা |
| তৈরি পোশাক | বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ার সুযোগ |
| চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য | রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা |
| পাট ও পাটজাত পণ্য | নতুন বাজার ও ক্রেতা তৈরির সুযোগ |
| কৃষিপণ্য | আমদানি সুবিধা বাড়ার প্রত্যাশা |
| প্লাস্টিক পণ্য | শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ সহজ হওয়ার সম্ভাবনা |
| খুচরা যন্ত্রাংশ | উৎপাদন ও শিল্প খাতে সরবরাহ সুবিধা বাড়তে পারে |
| বিদেশি বিনিয়োগ | দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনা |
| প্রযুক্তি সহযোগিতা | প্রযুক্তি গ্রহণ ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ |
| সরবরাহ ব্যবস্থাপনা | বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাবনা |
| রপ্তানি বহুমুখীকরণ | পোশাকনির্ভরতার বাইরে নতুন পণ্য ও খাত বিকাশের সুযোগ |
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি শুধু রপ্তানি বৃদ্ধির পথ তৈরি করবে না; বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৬ বছর আগে টেক্সটাইল খাতের ব্যবসায়িক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের যে সূচনা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় উৎপাদন ও পণ্যের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ককে কয়েকটি প্রচলিত খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন পণ্য, সেবা ও শিল্প খাতে সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বা সাপ্লাই চেইন খাতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এই সহযোগিতা কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে আরও শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শিল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
বিনিয়োগও সিইপিএ আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন কিংবা বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিল্প খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
তবে সম্ভাব্য এই চুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে বাংলাদেশকে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক মান ও পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সময়মতো সরবরাহ, উৎপাদন দক্ষতা এবং মূল্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারের চাহিদা, ভোক্তা আচরণ এবং বাণিজ্যিক মানদণ্ড সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে, সিইপিএ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার। তবে আলোচনার সমাপ্তি থেকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার পথটি নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের ব্যবসা ও শিল্প খাত কতটা দক্ষতার সঙ্গে নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে তার ওপর।
মন্তব্য