খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৪:১৩ পিএম

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪৬৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারের সমান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণও রয়েছে ৩১ হাজার ৬৫১ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে।
সোমবার (২ আগস্ট) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য থেকে রিজার্ভের এই চিত্র পাওয়া গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের যৌথ পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম মুনসি রিজার্ভের সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে ২ দশমিক ৮৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই মাসে এসেছিল ২ দশমিক ৪৭৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। এর ফলে আমদানি দায় পরিশোধসহ বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকিং খাতে ডলারের প্রাপ্যতা কিছুটা শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
জুলাইয়ের শেষ দুই দিন, অর্থাৎ ৩০ ও ৩১ জুলাই, প্রবাসী আয় প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদানের কথা বলা হলেও প্রকাশিত তথ্যে ওই দুই দিনে পাঠানো অর্থের পরিমাণ হিসেবে ১৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাইয়ের মোট রেমিট্যান্সের সঙ্গে তুলনা করলে এই অঙ্কটি স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এখানে মুদ্রার একক বা সংখ্যাগত ভুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যাচাই ছাড়া এই সংখ্যাকে নির্ভুল তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান বুঝতে গ্রস রিজার্ভ এবং বিপিএম৬ পদ্ধতির পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রস রিজার্ভে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মোট মজুতের তুলনামূলক বিস্তৃত হিসাব প্রতিফলিত হয়। অন্যদিকে, আইএমএফের বিপিএম৬ বা ব্যালান্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়ালের ষষ্ঠ সংস্করণভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে তুলনামূলকভাবে ব্যবহারযোগ্য ও যোগ্য বৈদেশিক সম্পদ বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাই একই সময়ে দুই পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের গুরুত্ব অনেক। জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির বিল পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় মেটানো এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা বজায় রাখতেও পর্যাপ্ত রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে স্বস্তি আসে। বিশেষ করে অর্থবছরের শুরুতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে তা সহায়ক হতে পারে। তবে রিজার্ভের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল নয়। রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেন—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব রিজার্ভের ওপর পড়ে।
ফলে জুলাইয়ে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও সামনে আরও কয়েকটি বিষয় নজরে থাকবে। প্রবাসী আয় প্রবাহের এই গতি আগামী মাসগুলোতে বজায় থাকে কি না, রপ্তানি আয় কীভাবে এগোয় এবং আমদানি ও বৈদেশিক পরিশোধের চাপ কতটা বাড়ে—এসবের ওপরই রিজার্ভের পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে। অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবণতা তাই স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত রিজার্ভের স্থায়িত্বের বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।
মন্তব্য