খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৩০ পিএম

জসপ্রিত বুমরাহর চোট ভারতের টেস্ট দলে খুলে দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আগে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের টেস্ট স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন জম্মু ও কাশ্মীরের ডানহাতি পেসার আকিব নবি। ২৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের জন্য এটি যেমন ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্বীকৃতি, তেমনি জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেট ইতিহাসেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত।
আকিব ভারতের সিনিয়র জাতীয় দলে ডাক পাওয়া জম্মু ও কাশ্মীরের তৃতীয় ক্রিকেটার। তাঁর আগে পারভেজ রসুল ও উমরান মালিক ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। তবে আকিবের সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় এক মাইলফলক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট একাদশে জায়গা পেয়ে মাঠে নামতে পারলে তিনিই হবেন ভারতের হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলা প্রথম কাশ্মীরি ক্রিকেটার। সেই সম্ভাবনাই তাঁর দলভুক্তিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।
বারামুল্লা জেলার একটি গ্রাম থেকে উঠে আসা আকিব দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে আসছেন। তাঁর উত্থান রাতারাতি নয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, দীর্ঘ স্পেলে বল করার সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার দক্ষতাই তাঁকে জাতীয় নির্বাচকদের নজরে এনেছে।
সাম্প্রতিক রঞ্জি ট্রফিতে আকিবের পারফরম্যান্স ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। ২০২৫-২৬ মৌসুমে পুরো প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ৬০টি উইকেট শিকার করেন তিনি। তাঁর বোলিং জম্মু ও কাশ্মীরের ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দলটির ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম রঞ্জি ট্রফি শিরোপা। এমন সাফল্যের মৌসুমে দলের পেস আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন আকিব।
গত দুই মৌসুম মিলিয়ে রঞ্জি ট্রফিতে তাঁর উইকেটসংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাঁর পরিসংখ্যান যথেষ্ট শক্তিশালী। ৪৩ ম্যাচে ১৮.৬৩ গড়ে ১৬২ উইকেট তাঁর ধারাবাহিকতারই প্রমাণ। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে একজন পেসারের যে ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও একই জায়গায় টানা বল করার সামর্থ্য প্রয়োজন, আকিবের ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসংখ্যান সেই দক্ষতারই ইঙ্গিত দেয়।
| বিষয় | আকিব নবির তথ্য |
|---|---|
| বয়স | ২৯ বছর |
| বোলিং | ডানহাতি পেস |
| জন্মভূমি | বারামুল্লা, জম্মু ও কাশ্মীর |
| জাতীয় দলে ডাক | প্রথমবার টেস্ট স্কোয়াডে |
| ভারতের সিনিয়র দলে জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেটার হিসেবে | তৃতীয় |
| প্রথম শ্রেণির ম্যাচ | ৪৩টি |
| প্রথম শ্রেণিতে উইকেট | ১৬২টি |
| প্রথম শ্রেণিতে বোলিং গড় | ১৮.৬৩ |
| ২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফিতে উইকেট | ৬০টি |
| গত দুই মৌসুমে রঞ্জি ট্রফির উইকেট | ১০০-এর বেশি |
| ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কায় চার দিনের ম্যাচ | ২টি |
| শ্রীলঙ্কা সফরে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে উইকেট | ৬টি |
| আইপিএল ২০২৬ দল | দিল্লি ক্যাপিটালস |
শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনের সঙ্গেও আকিবের কিছুটা পরিচয় রয়েছে। ভারত ‘এ’ দলের হয়ে দেশটির সফরে দুটি চার দিনের ম্যাচ খেলেছেন তিনি এবং মোট ছয়টি উইকেট নিয়েছেন। ফলে শ্রীলঙ্কার পরিবেশ, পিচের আচরণ এবং সেখানকার ক্রিকেট পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। টেস্ট সিরিজে খেলার সুযোগ পেলে এই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে।
ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি ২০২৬ সালের আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতাও আকিবের ঝুলিতে যোগ হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তাঁকে উচ্চপর্যায়ের ক্রিকেটের চাপ, বড় মঞ্চ এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা দিয়েছে। যদিও টেস্ট ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ ভিন্ন, তবু সেই অভিজ্ঞতা আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
আকিবের জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মূল কারণ অবশ্য বুমরাহর অনুপস্থিতি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে পাওয়া হাঁটুর চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় ভারতের তারকা পেসারকে শ্রীলঙ্কা সিরিজের দল থেকে বাইরে রাখা হয়েছে। বেঙ্গালুরুর জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে বুমরাহর পুনর্বাসন ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফেরার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ভারতের সামনে ব্যস্ত ক্রিকেট সূচি থাকায় তাঁকে তাড়াহুড়ো করে মাঠে ফেরানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না দলীয় ব্যবস্থাপনা।
বুমরাহর অনুপস্থিতির পাশাপাশি নিতিশ কুমার রেড্ডি, হর্ষিত রানা ও ওয়াশিংটন সুন্দরও অন্তত প্রথম টেস্টের জন্য দলের বাইরে থাকায় ভারতের স্কোয়াডে কিছুটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আকিবের অন্তর্ভুক্তি শুধু সংখ্যাগত ঘাটতি পূরণের বিষয় নয়; ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করা একজন পেসারকে আন্তর্জাতিক দলের পরিবেশে প্রস্তুত করারও সুযোগ।
তবে স্কোয়াডে জায়গা পাওয়া আর চূড়ান্ত একাদশে খেলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আকিবের সামনে এখন দলের সঙ্গে অনুশীলনে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করার সুযোগ। একাদশে সুযোগ পেলে নতুন বলে নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ স্পেলে ধারাবাহিকতা এবং ধৈর্য ধরে চাপ তৈরি করাই হবে তাঁর বড় পরীক্ষা।
সবচেয়ে বড় কথা, আকিব নবির জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার ঘটনা তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। বারামুল্লার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি এখন ভারতের টেস্ট দলের দরজায়। সেই দরজা পেরিয়ে মাঠে নামতে পারলে তাঁর অভিষেক শুধু একটি নতুন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা হবে না, জম্মু ও কাশ্মীরের ক্রিকেট ইতিহাসেও যুক্ত হবে একটি স্মরণীয় অধ্যায়। এখন অপেক্ষা, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক অভিষেকের সুযোগ শেষ পর্যন্ত আসে কি না।
মন্তব্য