খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৮ পিএম

প্রায় নয় বছর আগে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় স্ত্রী শাকির খাতুন সোমাকে হত্যার দায়ে মনির হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. সাদেকীন হাবীব এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার দিন কারাগার থেকে মনির হোসেনকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রায় পড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে তাঁকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আলোচিত এ হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট।
মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মনির হোসেন ও শাকির খাতুন সোমার বিয়ে হয় ২০০৩ সালে। তাঁদের সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের কয়েক বছর পর ব্যবসার জন্য অর্থের প্রয়োজনের কথা বলে মনির তাঁর স্ত্রীর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করতে শুরু করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে প্রায় ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
তবে টাকা দেওয়ার পরও সোমার ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, অর্থের জন্য চাপ দেওয়ার পাশাপাশি সোমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। একপর্যায়ে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতনের কারণে সোমাকে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আর নির্যাতন করবেন না—এমন আশ্বাস দিয়ে মনির তাঁকে আবার নিজের বাসায় ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু ফিরে আসার পরও তাঁদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও নির্যাতনের পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটেনি বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়।
ঘটনার দিন ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর দুপুরে টাকা-পয়সা নিয়ে মনির ও সোমার মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একপর্যায়ে মনির ছুরি দিয়ে সোমার গলায় আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় সোমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর ওই দিনই সোমার মা মোছা. আক্তার বানু বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তে পুলিশ মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তসংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ১৭ মে মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
বিচারপর্বে রাষ্ট্রপক্ষ মামলার মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৫ জনকে আদালতে হাজির করে সাক্ষ্য গ্রহণ করে। তাঁদের সাক্ষ্য, মামলার নথিপত্র এবং অন্যান্য উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত মনির হোসেনকে স্ত্রী হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেন। এরপর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার বিচার চলাকালে মনির হোসেন দীর্ঘ সময় জামিনে ছিলেন। পরে গত ১৪ জুলাই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ওই দিন আদালত রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারিত তারিখ ঠিক করার পাশাপাশি তাঁর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। নির্ধারিত দিনে তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক রায় ঘোষণা করেন।
মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রায় নয় বছর ধরে চলা সোমা হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। তবে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী আসামির উচ্চ আদালতে আপিল ও অন্যান্য বিচারিক প্রতিকারের সুযোগ থাকে। ফলে নিম্ন আদালতের এই রায়ের পরও মামলাটির আইনি প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার রায়কে নিহতের পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষ ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হওয়ায় পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় মামলার নথি, সাক্ষ্য ও প্রমাণের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবে।
মন্তব্য