খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৯ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করে ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা চালিয়েছে তেহরান। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বুধবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী তিনটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের তৈরি করা হুমকি কমানোই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে তেহরান।
মার্কিন হামলার পর ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসসহ বেশ কিছু কৌশলগত স্থাপনার আশপাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এর জবাবে ইরান টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কুয়েত ও বাহরাইনে হামলা চালায়। এই দুই দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা রয়েছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। একই সময়ে কাতারও সাময়িকভাবে নিরাপত্তা সতর্কতা বাড়ালেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, আগের দিন জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে না এবং দ্রুতই স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
এর আগে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারককে স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দেওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, নতুন সংঘাতের কারণে তা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার কাছে ওই সমঝোতা কার্যত শেষ বলেই মনে হচ্ছে। তিনি ইরানের ওপর আস্থার সংকটের কথাও উল্লেখ করেন।
ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হুমকি ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কোনো ছাড় আদায় করতে পারবে না। তিনি দাবি করেন, ইরানের ওপর হামলা হলে তেহরানও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
নতুন সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। বুধবার গ্রিনিচ সময় রাত ১২টা ৫৪ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে পৌঁছায়। তবে এপ্রিলের শেষ দিকে যে দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের বেশি ছিল, তার তুলনায় বর্তমান মূল্য এখনো নিচে রয়েছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল। হরমুজ প্রণালি থেকে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এই হামলা চালানো হয়। আক্রান্ত স্থানের মধ্যে ছিল বন্দর আব্বাস, কোনারাক ও চাবাহার। বন্দর আব্বাস ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, যেখানে নৌঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা রয়েছে।
চাবাহারের কয়েকটি এলাকায় হামলার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও পরে বেশির ভাগ এলাকায় তা স্বাভাবিক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সমুদ্রপথের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কিছু স্থাপনাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর শহরের বিমানবন্দরে হামলায় এক দমকলকর্মী নিহত হওয়ার কথাও দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দুই দেশের মধ্যে হওয়া সমঝোতার শর্তের বিরোধী।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে সরে আসার বিষয়টিও দেশটি বিবেচনা করতে পারে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের স্থায়ী মিশন অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো এ অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য