উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার ক্ষোভে সিরাজগঞ্জে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিম বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় পোলট্রি খামারিরা। ক্রমাগত লোকসান গুনতে গুনতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণে খামার মালিকেরা সম্মিলিতভাবে এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খামারিদের এই আকস্মিক ধর্মঘটের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জেলার খুচরা ও পাইকারি বাজারগুলোতে। ইতিমধ্যেই বাজারে ডিমের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সিরাজগঞ্জের সুপ্ত পোলট্রি ফার্ম অ্যান্ড ফিডের মালিক মোস্তাক আহমেদ এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকায় জেলা খামার মালিকদের একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সবার সম্মতিক্রমে ডিম বিক্রি বন্ধ রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত রবিবার বিকেল ৫টা থেকে জেলার কোনো খামারি আর পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ডিম বিক্রি করছেন না।
সিন্ডিকেটের কবলে খামারিরা, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
আন্দোলনরত খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি ফিড বা মুরগির খাদ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কারণে বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদন করতে তাদের খরচ হচ্ছে প্রায় ৯ টাকা। অথচ মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদার সিন্ডিকেট করে ডিমের দাম মাত্র ৭ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। ফলে প্রতিটি ডিমে খামারিদের এক টাকারও বেশি লোকসান দিতে হচ্ছে।
শিয়ালকোল এলাকার ভুক্তভোগী খামারি লোকমান হোসেন নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিনরাত খাটুনি করে আমরা খামারে ডিম উৎপাদন করি। অথচ সেই ডিমের দাম কত হবে তা নির্ধারণ করে দেয় কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী। তারা সিন্ডিকেট করে আমাদের কাছ থেকে পানির দামে ডিম কিনে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।” আরেক খামারি গোলাম মোস্তফা জানান, লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে ইতিমধ্যে জেলার অনেক ছোট ও মাঝারি খামার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। খামারিদের বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সংগতি রেখে ডিমের দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাজারে সরবরাহে টান, বিপাকে সাধারণ ক্রেতা
এদিকে খামার থেকে ডিম সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরের বাজারগুলোতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারে ডিম মিলছে না। শহরের ডিম বিক্রেতা আলাউদ্দিন বলেন, “আগে যেখানে প্রতিদিন নিয়মিত ডিম আসত, এখন তা একেবারেই বন্ধ। দোকানে ক্রেতারা এসে ফিরে যাচ্ছেন। আমরা নিজেরাও সংকটে আছি, কারণ আড়ত থেকে বেশি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে।”
বাজারে ডিম কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতা মো. রাশিদুল ইসলাম বলেন, “ডিম হলো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস। হঠাৎ করে বাজারে ডিম গায়েব হয়ে গেলে আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কী সমস্যা হয়েছে, তা সরকারের উচিত টেবিল বৈঠকে বসে দ্রুত সমাধান করা।”
এই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক জানান, ডিমের দাম নির্ধারণ করার এখতিয়ার একমাত্র সরকারের, কোনো ব্যবসায়ী নিজের ইচ্ছামতো দাম ঠিক করতে পারেন না। তবে তার দাবি, বর্তমানে বাজারে ডিমের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমেছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয়। দ্রুত সমাধান না হলে ডিমের বাজার আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।









