চেতনার বাতিঘর বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চিন্তার জগতে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন এক অনন্য আলোকবর্তিকা। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ বা গবেষকই নন, ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও চিন্তার দীপ্তি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটে তাঁর জন্ম। দেশভাগের পর পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, মননশীল ও সাহিত্যপ্রেমী। ছাত্রজীবনেই ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন এবং পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি University of Dhaka-এর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে একই বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে তিনি অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর প্রিয় শিক্ষক, অনুপ্রেরণাদাতা ও পথপ্রদর্শক ছিলেন। অধ্যাপনা জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তা নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল গভীর ও প্রামাণ্য। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্র-নজরুল গবেষণা, ভাষা আন্দোলন, বাঙালির সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে — ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘কাল নিরবধি’, ‘বিপুলা পৃথিবী’, ‘আমার একাত্তর’ প্রভৃতি। বিশেষ করে আমার একাত্তর মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার এক মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ঐতিহাসিক পর্বে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পরও তিনি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, আনন্দ পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৮৫ সালে তিনি Bangla Academy সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন এবং পরবর্তীতে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হন—যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ একাডেমিক স্বীকৃতিগুলোর অন্যতম। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন বিনয়ী, মার্জিত ও অসাধারণ মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞানচর্চা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য নয়, সমাজকে আলোকিত করার জন্যও জরুরি। তাঁর লেখনী ও বক্তব্যে সবসময় মানবতা, যুক্তিবাদ ও প্রগতির আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে। ২০২০ সালের ১৪ মে রাজধানীর Combined Military Hospital-এ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারায় এক প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, বিশিষ্ট গবেষক ও মুক্তচিন্তার অন্যতম অভিভাবককে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনার এই অনন্য বাতিঘরকে।
