অক্সিজেন মাস্ক খুলে শিশুমৃত্যু

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাত মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নেগলিজেন্স বা অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল দুপুরে এই ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। শিশুটির পরিবার দাবি করেছে, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মীর অসতর্কতার কারণেই এই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল শিশুটি। প্রথমে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় আনা হয়।

শিশুটির বাবা হেলাল মিয়া একটি স্বর্ণালংকারের দোকানে কাজ করেন এবং মা মেঘলা খাতুন একজন পোশাকশ্রমিক। পরিবারটি গাজীপুরের বাসন এলাকায় বসবাস করে। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার পার্বতীপুর এলাকায়।

পরিবারের অভিযোগ, ঢাকায় পৌঁছানোর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় তাদের অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাদের শিশু বিভাগের দিকে পাঠানো হয় শয্যা খোঁজার জন্য।

পরিবারের দাবি, হাসপাতালের এক কর্মী এনায়েত করিম তাদের শিশু বিভাগে নিয়ে গিয়ে জানান সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। এরপর তিনি কাতাবনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন, যেখানে প্রতিদিন চিকিৎসার খরচ প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।

এই সময়ই সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠে আসে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানান্তরের প্রস্তুতির সময় ওই কর্মী শিশুটির অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলেন এবং প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকেন। পরে যখন তারা ভবন নম্বর দুইয়ের সামনে অ্যাম্বুলেন্সে শিশুটিকে তোলেন, তখনই তারা বুঝতে পারেন শিশুটি আর বেঁচে নেই।

ঘটনার পর স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারা অভিযুক্ত কর্মীকে আটক করে হাসপাতাল পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে অবশ্য পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অভিযুক্ত কর্মী দাবি করেন, শয্যা না থাকায় তিনি শুধু সহায়তা করছিলেন এবং একটি নিকটবর্তী হাসপাতালে যোগাযোগ করে নিশ্চিত তথ্য এনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন। অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা কেন ঠিক রাখা হয়নি—এ বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।

শিশুটির মামা রফিক জানান, শুরুতে শিশুটির ডায়রিয়া ধরা পড়লেও পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনির জটিলতা শনাক্ত হয়। পরিবারটি বিভিন্ন হাসপাতালের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিল।

পরবর্তীতে পুলিশ জানিয়েছে, শুরুতে অভিযোগ থাকলেও পরে পরিবার লিখিতভাবে জানিয়েছে যে তারা কোনো মামলা করতে চায় না। মামলা হলে ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক হওয়ায় তারা সেই প্রক্রিয়ায় যেতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার পর শিশুটির মরদেহ নিয়ে পরিবারটি রংপুরে ফিরে যায়।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত সময়রেখা

সময়ঘটনা
পূর্ববর্তী সময়রংপুর ও অন্যান্য হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা
দুপুরঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগমন
হাসপাতাল পর্যায়শয্যা না থাকার তথ্য ও অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ
স্থানান্তর প্রস্তুতিঅক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলার অভিযোগ
স্থানান্তর চলাকালীনঅ্যাম্বুলেন্স খোঁজার সময় বিলম্ব
অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময়শিশুর মৃত্যু শনাক্ত
পরবর্তী সময়পুলিশ হস্তক্ষেপ, পরে অভিযোগ প্রত্যাহার

এই ঘটনা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, জরুরি সেবা সমন্বয় এবং রোগী স্থানান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পরিবারটির অভিযোগ সত্য হলে এটি চিকিৎসা সেবায় বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন অনেকে।