এক দুর্ঘটনায় ভাঙল দুই পরিবার

ফেনীতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাবা ও তাঁর একমাত্র ছেলে, আর একই সঙ্গে দুই নারী হারিয়েছেন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের। ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ইউটার্ন নেওয়ার সময়।

নিহতরা হলেন নুর আলম (৩৮) এবং তাঁর একমাত্র ছেলে নুর হাসনাত নীরব (১৬)। নুর আলম ছিলেন পেশায় একটি অ্যাম্বুলেন্সের চালক। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তাঁর ভাগনে আফজাল হোসেন মিঠু (৩১), যিনি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দুর্ঘটনার বিবরণ

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, নুর আলম তাঁর মোটরসাইকেলে করে ছেলে, ভাগনে ও আরও এক আত্মীয়সহ মহাসড়কে ইউটার্ন নিচ্ছিলেন। এ সময় চট্টগ্রামগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলেই সবাই গুরুতর আহত হন।

আহতদের দ্রুত ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে নুর আলমকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে নুর হাসনাত নীরবের মৃত্যু হয়। অপর আহত আফজাল হোসেন মিঠু পরে চট্টগ্রামে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকেন এবং অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে ঢাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শোকের মাতম

একই দুর্ঘটনায় স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নাসিমা আক্তার (৩৬)। অপরদিকে নুর আলমের ৭৫ বছর বয়সী মা ফাতেমা খাতুনও একমাত্র সন্তান ও নাতিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। পরিবারটি এখন কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

গ্রামের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার রাজাপুরে নেমে আসে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহতদের দাফনের আগে দুই দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।

পারিবারিক শোকগাথা

নুর আলমের স্ত্রী নাসিমা আক্তারের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছেন না। প্রতিবেশীরা জানান, নুর আলম পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে।

নুর আলমের মেয়ে তাহমিনা সুলতানা জানান, ঘটনার আগের দিনই তিনি বাবার সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খেয়েছিলেন এবং সেটিই ছিল তাদের শেষ দেখা। তিনি বলেন, পরিবারের স্বপ্ন ছিল ভাইকে বিদেশে পাঠিয়ে ভবিষ্যৎ গড়া, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।

দুর্ঘটনায় হতাহতদের তথ্য

ব্যক্তিবয়সঅবস্থাসম্পর্কবিবরণ
নুর আলম৩৮নিহতবাবাঅ্যাম্বুলেন্স চালক
নুর হাসনাত নীরব১৬নিহতছেলেশিক্ষার্থী
আফজাল হোসেন মিঠু৩১গুরুতর আহতভাগনেচিকিৎসাধীন
নাসিমা আক্তার৩৬মানসিকভাবে বিপর্যস্তস্ত্রীস্বামী ও সন্তান হারান
ফাতেমা খাতুন৭৫শোকাহতমাএকমাত্র ছেলে ও নাতি হারান

শেষ বিদায় ও গ্রামীণ শোক

সহকর্মীদের উদ্যোগে নিহত নুর আলমের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সহকর্মীদের বহু অ্যাম্বুলেন্স একসঙ্গে সাইরেন বাজিয়ে গ্রামে প্রবেশ করলে পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। জানাজায় স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশ নেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, একই দুর্ঘটনায় দুই প্রজন্মের মৃত্যু গ্রামবাসীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া

স্থানীয় থানার কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।