নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লায় আবাসিক এলাকায় জমা হওয়া গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার ভোর ছয়টার দিকে সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার অন্তর্গত কুতুবপুর লাকি বাজার এলাকার একটি টিনশেড বাড়িতে এই দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এতে একই পরিবারের গৃহকর্তা এবং তাঁর তিন কিশোর পুত্র গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছেন। বর্তমানে তাঁরা রাজধানীর জাতীয় দগ্ধ ও পুনর্গঠনকারী শল্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ ও কারণ
ফতুল্লার লাকি বাজার এলাকায় শওকত আলী গাজীর মালিকানাধীন একটি টিনশেড বাড়িতে ভাড়া থাকতেন আবদুল কাদির ও তাঁর পরিবার। পেশায় চটপটি ও ফুচকা বিক্রেতা কাদিরের ঘরে সোমবার ভোরে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ঘরের দরজা ও জানালা উড়ে যায় এবং আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিস্ফোরণের সময় বাড়ির বাসিন্দারা ঘুমিয়ে ছিলেন এবং আকস্মিক এই শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে।
হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্যাস পাইপলাইনের ছিদ্র বা লিকেজ থেকে সারারাত ঘরের ভেতরে গ্যাস নির্গত হয়ে একটি আবদ্ধ প্রকোষ্ঠ বা চেম্বার তৈরি করেছিল। পরে ভোরের দিকে কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম অথবা অন্য কোনো উৎস থেকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ বা স্পার্ক সৃষ্টি হলে জমে থাকা গ্যাসে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা মো. নুরুল আলম জানিয়েছেন, বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞগণ এই দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করবেন।
দগ্ধদের শারীরিক অবস্থা
বিস্ফোরণের পর এলাকাবাসী দ্রুত দগ্ধদের উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ চারজনের শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশ পুড়ে গেছে। গৃহকর্তা আবদুল কাদিরের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁর স্ত্রী দুর্ঘটনার সময় ঘরের বাইরে থাকায় অক্ষত রয়েছেন।
দগ্ধদের শারীরিক অবস্থার পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| দগ্ধ ব্যক্তির নাম | বয়স (বছর) | শরীরের দগ্ধ হওয়ার পরিমাণ (শতকরা) | বর্তমান অবস্থা |
| আবদুল কাদির | ৫০ | ৫৭% | আশঙ্কাজনক |
| মেহেদী | ১৭ | ১৮% | চিকিৎসাধীন |
| সাকিব | ১৬ | ১৭% | চিকিৎসাধীন |
| রাকিব | ১৬ | ২৫% | চিকিৎসাধীন |
পূর্ববর্তী দুর্ঘটনার রেশ ও একজনের মৃত্যু
উল্লেখ্য যে, ফতুল্লা এলাকায় এই ধরণের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। গত রবিবার ফতুল্লার উত্তর ভুঁইগড় গিরিধারা এলাকায় গ্যাসলাইনের ছিদ্র থেকে হওয়া অপর এক বিস্ফোরণে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য দগ্ধ হয়েছিলেন। আজ সোমবার বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেই পরিবারের প্রধান, আবুল কালাম (৩৫), মৃত্যুবরণ করেছেন। জাতীয় দগ্ধ ও পুনর্গঠনকারী শল্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান এই মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত আবুল কালাম পেশায় একজন সবজি বিক্রেতা ছিলেন এবং তাঁর শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরাও বর্তমানে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই পর পর দুইটি বিস্ফোরণের ঘটনা নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ আবাসিক এলাকার গ্যাস সংযোগের নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আবাসিক বাড়িতে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিকেজ পরীক্ষা এবং যথাযথ বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
