বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অন্যতম কাণ্ডারি ঋতুপর্ণা চাকমা ক্রীড়াঙ্গনে আরও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এবার তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের ঘরোয়া ফুটবল লিগে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে ঋতুপর্ণা কেবল নিজের ক্যারিয়ারে নতুন পালক যুক্ত করছেন না, বরং বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম কোনো খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের কোনো দেশের ঘরোয়া লিগে খেলার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন।
Table of Contents
চুক্তির বিস্তারিত ও ক্লাবের পটভূমি
মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠিত ফুটবল ক্লাব আয়েইয়াওয়াদি এফসি-র সাথে আগামী তিন মাসের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। ক্লাবটি বর্তমানে মিয়ানমারের নারী ফুটবল অঙ্গনে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমের মিয়ানমার উইমেন্স ফুটবল লিগে আয়েইয়াওয়াদি এফসি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে এবং এর ফলে তারা এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে ঋতুপর্ণা চাকমাকে ক্লাবটি মূলত আগামী ২০২৬-২৭ ঘরোয়া মৌসুমের জন্য তাদের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করছে।
যাত্রার সময়সূচি ও আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা
পেশাদার এই লিগে অংশগ্রহণের জন্য ঋতুপর্ণার মিয়ানমার যাত্রার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১২ জুন। তবে এর আগে তাকে জাতীয় দলের হয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে হবে। চলতি মাসের ২৫ তারিখ ভারতের গোয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের এই লড়াই শেষ করেই তিনি মিয়ানমারের ক্লাবে যোগ দেবেন। জাতীয় দলের প্রধান এই খেলোয়াড়কে ঘিরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের অনেক বড় প্রত্যাশা রয়েছে।
ঋতুপর্ণার ক্যারিয়ার ও পরিসংখ্যানগত সাফল্য
ঋতুপর্ণা চাকমা কেবল ঘরোয়া লিগে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমানভাবে উজ্জ্বল। এর আগে তিনি ভুটানের লিগে পারো এফসি এবং রয়েল থিম্পু কলেজ এফসি-র হয়ে খেলেছেন। ভুটান লিগে পারো এফসির জার্সি গায়ে তিনি ৮ ম্যাচে ১৩টি গোল করে নিজের গোল করার পারদর্শিতা প্রমাণ করেছিলেন। এছাড়া রয়েল থিম্পু কলেজ এফসির হয়ে তিনি এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই আসরে ইরানের শক্তিশালী বাম খাতুন এফসির বিপক্ষে তিনি একটি দর্শনীয় গোলও করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সিতে এখন পর্যন্ত ৩৮টি ম্যাচ খেলে ১৩টি গোল করার কৃতিত্ব রয়েছে তার।
মিয়ানমারের সাথে ঋতুপর্ণার বিশেষ সংযোগ
ঋতুপর্ণার মিয়ানমার যাওয়ার বিষয়টি ফুটবল প্রেমীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে মিয়ানমারকে হারিয়ে বাংলাদেশের চূড়ান্ত পর্বে ওঠার মূলে ছিল ঋতুপর্ণার অনবদ্য পারফরম্যান্স। সেই ম্যাচে তার করা জোড়া গোলের মাধ্যমেই বাংলাদেশ জয় নিশ্চিত করেছিল, যা ছিল দেশের নারী ফুটবলের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। যে দেশের বিপক্ষে গোল করে তিনি দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন, আজ সেই দেশের ঘরোয়া লিগেই তিনি আমন্ত্রিত খেলোয়াড় হিসেবে মাঠ মাতাতে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের নারী ফুটবলে নতুন ইতিহাস
বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা এর আগে মালদ্বীপ, ভারত, ভুটান এবং নেপালের ঘরোয়া লিগগুলোতে নিয়মিত খেলেছেন। সাবিনা খাতুন থেকে শুরু করে কৃষ্ণা রানী সরকার—অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন লিগে নিজেদের জাত চিনিয়েছেন। তবে ঋতুপর্ণা চাকমা এই প্রথা ভেঙে প্রথম বাংলাদেশি নারী ফুটবলার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে পেশাদার লিগ খেলতে যাচ্ছেন। তার এই যাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য উদীয়মান নারী ফুটবলারদের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ জুন ঋতুপর্ণা চাকমা মিয়ানমারের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। তার এই তিন মাসের সফর বাংলাদেশের নারী ফুটবলের পেশাদারিত্বকে বিশ্বদরবারে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাতীয় দলের হয়ে সাফে সাফল্য অর্জন এবং এরপর মিয়ানমারের লিগে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা—এই দ্বিমুখী লক্ষ্য নিয়েই এখন চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশের এই ফুটবল সুপারস্টার।
