ওপেনএআই মামলায় ইলন মাস্কের সাক্ষ্য ও তর্ক চলমান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে কেন্দ্র করে চলমান একটি আইনি মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে আদালতে দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। শুনানিতে সাক্ষ্য প্রদানকালে উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ঘটে। মামলাটি ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের পরিচালনা কাঠামো ও নীতিগত দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ইলন মাস্ক আদালতে অভিযোগ করেন যে ওপেনএআই শুরুতে অলাভজনক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে এটি লাভজনক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে দাতব্য ধরনের অলাভজনক সুবিধা গ্রহণ করে আবার ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে পারে না। তার ভাষায়, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বজায় রেখে একই সঙ্গে লাভ অর্জনের চেষ্টা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে ওপেনএআই পক্ষের আইনজীবী বিল স্যাভিট এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি আদালতে যুক্তি দেন যে ইলন মাস্ক শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির অলাভজনক কাঠামো বজায় রাখার বিষয়ে পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন না। এই বক্তব্যের জবাবে দুই পক্ষের মধ্যে জেরার সময় তর্কাতর্কি আরও তীব্র হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিচারক উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেন।

শুনানিতে ইলন মাস্কের পূর্ববর্তী আর্থিক প্রতিশ্রুতিও আলোচনায় আসে। তিনি একসময় ওপেনএআইকে বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার পরিমাণ প্রায় একশো কোটি মার্কিন মুদ্রা সমমূল্যের ছিল। তবে আদালতে তিনি স্বীকার করেন যে পরবর্তীতে তিনি সেই সম্পূর্ণ অর্থ প্রদান করেননি। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারানোর কারণে তিনি পুরো অর্থ প্রদান থেকে বিরত থাকেন। তিনি জানান, পরিবর্তে তিনি প্রায় আটত্রিশ কোটি মার্কিন মুদ্রা সমমূল্যের অর্থ প্রদান করেছেন।

ওপেনএআই ২০১৫ সালে একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে লাভজনক মডেলের দিকে অগ্রসর হয়। গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠানটি একটি বড় ধরনের পুনর্গঠন সম্পন্ন করে, যার মাধ্যমে এটি প্রচলিত লাভজনক কর্পোরেট কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। যদিও একটি অলাভজনক তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা এখনো এর ওপর নজরদারি বজায় রেখেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি একটি বিনিয়োগ পর্বে প্রায় একশ বাইশ বিলিয়ন মার্কিন মুদ্রা সমমূল্যের তহবিল সংগ্রহ করেছে বলে জানানো হয়।

মাস্ক আদালতের কাছে আবেদন করেছেন যাতে ওপেনএআইকে সম্পূর্ণভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। একই সঙ্গে তিনি ওপেনএআই এবং এর প্রধান বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে প্রায় একশ চৌত্রিশ বিলিয়ন মার্কিন মুদ্রা সমমূল্যের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

অন্যদিকে ওপেনএআই পক্ষের বক্তব্য হলো, ইলন মাস্ক নিজেই প্রতিষ্ঠানটি ত্যাগ করেন। তাদের দাবি, তিনি নেতৃত্ব কাঠামোয় প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ না পেয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়ান। এছাড়া তারা উল্লেখ করেন যে মাস্ক পূর্বে প্রতিশ্রুত অর্থের সম্পূর্ণ অংশ প্রদান করেননি।

শুনানিতে ইলন মাস্ক আরও বলেন যে অর্থ ছাড়াও তিনি তাঁর পরিচিতি, যোগাযোগ এবং পরামর্শের মাধ্যমে ওপেনএআইকে সহায়তা করেছেন। তবে বিচারক তাকে জেরার সময় সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিতে নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, ইলন মাস্ক ২০১৮ সালে ওপেনএআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি একটি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন, যা লাভজনক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

নিচে মামলার প্রধান বিষয়গুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়ইলন মাস্কের অবস্থানওপেনএআই পক্ষের অবস্থান
প্রতিষ্ঠানের কাঠামোঅলাভজনক থেকে লাভজনক হওয়া অনুচিতকাঠামোগত পরিবর্তন বৈধ ও প্রয়োজনীয়
আর্থিক প্রতিশ্রুতিআংশিক অর্থ প্রদান করা হয়েছেপ্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়নি
প্রতিষ্ঠান ত্যাগআস্থা হারিয়ে সরে দাঁড়ানোনেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ না পেয়ে সরে যাওয়া
দাবিরূপান্তর বন্ধ ও ক্ষতিপূরণ দাবিঅভিযোগ অস্বীকার

এই মামলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।