ড. আখলাকুর রহমানের জীবনকথা

বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণের ইতিহাসে ড. এম আখলাকুর রহমান এক অনন্য ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন একাধারে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক এবং মানবতাবাদী কর্মী—যাঁর জীবনজুড়ে জ্ঞান, নীতি ও মানবিকতার এক অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়।

১৯২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার তেঘরিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল জ্ঞানপিপাসা। মাত্র তিন বছর বয়সে পিতার পরিচালিত পাঠশালায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে বালাগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বিদ্যালয় শিক্ষা শেষে তিনি সিলেটের মদনমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

মেধা ও অধ্যবসায়ের স্বাক্ষর রেখে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে গবেষণার তাগিদে তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং একটি অর্থনৈতিক সাময়িকীর সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে করাচির পাকিস্তান উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ হিসেবে যোগ দেন।

১৯৬২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর গবেষণাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত চিত্র

পর্যায়প্রতিষ্ঠানউল্লেখযোগ্য অর্জন
প্রাথমিক শিক্ষাপারিবারিক পাঠশালাজ্ঞানচর্চার সূচনা
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকবালাগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মদনমোহন কলেজশিক্ষাজীবনের ভিত্তি দৃঢ়
স্নাতকআলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়১৯৪৭ সালে ডিগ্রি অর্জন
স্নাতকোত্তরঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়অর্থনীতিতে বিশেষায়ন
গবেষণাম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ
পিএইচডিম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি১৯৬২ সালে ডক্টরেট অর্জন

দেশে ফিরে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি তাঁকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করে।

ড. আখলাকুর রহমান রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও ছিলেন সক্রিয়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে তাঁর চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করলেও আটকে পড়া বাঙালিদের সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ ও মানবিক সহায়তার উদ্যোগ নেন, যা তাঁর গভীর দেশপ্রেমের প্রমাণ বহন করে।

তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।

মানবসেবার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। কিশোর বয়সে বানিয়াচংয়ে ম্যালেরিয়ার মহামারীতে তিনি নিজে আক্রান্ত হয়েও মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এই মানবিক চেতনা তাঁর সমগ্র জীবনের প্রতিফলন।

আধ্যাত্মিক জীবনে তিনি ধ্যান ও যোগচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে যোগচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৯২ সালের ৪ মে এই মহান ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন আজও জ্ঞান, নীতি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয়।