নাটোরে মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে আহত মায়ের মৃত্যু: অভিযুক্তকে কারাগারে প্রেরণ

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় মাদক ক্রয়ের অর্থ না পেয়ে জন্মদাত্রী মায়ের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজেদা বেগম (৫৫) মৃত্যুবরণ করেছেন। শুক্রবার (১ মে) বিকেলে উপজেলার পশ্চিমপাড়া মহল্লায় নিজ বাড়িতে এই হামলার শিকার হন তিনি। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করার পর গত রবিবার (৩ মে) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে রাজনকে ঘটনার পরপরই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও পারিবারিক কলহের প্রেক্ষাপট

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত রাজন দীর্ঘকাল ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। কোনো নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান না থাকায় তিনি প্রায়ই নেশার অর্থের জন্য তার বৃদ্ধা মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন। গত শুক্রবার বিকেলে রাজন তার মা সাজেদা বেগমের নিকট নেশার দ্রব্য ক্রয়ের জন্য ৫০০ টাকা দাবি করেন। সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া মা ছেলের এই অন্যায্য আবদার প্রত্যাখ্যান করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় রাজন ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের সাথে উগ্র আচরণ শুরু করেন।

বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ঘর থেকে একটি ধারালো ছুরি নিয়ে এসে মা সাজেদা বেগমের পেটে সজোরে আঘাত করেন রাজন। ছুরিকাঘাতের ফলে ভুক্তভোগীর পেটের অভ্যন্তরীণ অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় উঠানে লুটিয়ে পড়েন। তার আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসলে অভিযুক্ত রাজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে স্থানীয়রা তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

চিকিৎসা কার্যক্রম ও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া

রক্তাক্ত অবস্থায় প্রতিবেশীরা সাজেদা বেগমকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় এবং শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। রামেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তির পরপরই চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ক্ষুদ্রান্ত্র ও পাকস্থলীর একাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের কারণে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। অবশেষে রবিবার সন্ধ্যায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাতেই বিষয়টি বড়াইগ্রাম থানা পুলিশকে অবহিত করে। সোমবার সকালে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্তকে গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়া

হামলার ঘটনার পরপরই বড়াইগ্রাম থানা পুলিশের একটি দল পশ্চিমপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত রাজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান যে, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে।

প্রাথমিকভাবে রাজনের বিরুদ্ধে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হওয়ায় বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলাটি এখন পেনাল কোডের সংশ্লিষ্ট ধারা মোতাবেক একটি হত্যাকাণ্ড বা খুনের মামলায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ওসি আরও জানান, অভিযুক্তকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।

সামাজিক উদ্বেগ ও মাদকাসক্তির কুফল

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড়াইগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের আবহ বিরাজ করছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা জানান, রাজনের মাদকাসক্তির বিষয়টি এলাকায় পরিচিত ছিল। মাদকের নীল দংশনে একটি সুখী পরিবার কীভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এই ঘটনা তার একটি জলজ্যান্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

নিহতের পরিবারের স্বজনরা অভিযুক্ত রাজনের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মাদকের টাকার জন্য গর্ভধারিণী মাকে হত্যার মতো অপরাধ কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না।

প্রশাসনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

বড়াইগ্রাম থানা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তা আদালতে পেশ করা হবে। পুলিশি তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হচ্ছে। মাদকাসক্তির ফলে সৃষ্ট এ ধরনের অপরাধ রুখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাজেদা বেগমের মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। নিহতের জানাজা ও দাফন পশ্চিমপাড়া মহল্লার কেন্দ্রীয় কবরস্থানে সম্পন্ন হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। মাদকের নেশার করাল গ্রাসে নিজের মায়ের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এই ঘটনাটি নাটোর জেলা জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।