ইলেকট্রিক বাস ও ভারী ট্রাক আমদানিতে সরকার ঘোষিত ব্যাপক শুল্ক-কর অব্যাহতি

দেশের পরিবহন খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার ইলেকট্রিক যানবাহন আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক-কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। রোববার (৩ মে) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশে বৈদ্যুতিক বাসের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের মূল প্রেক্ষাপট

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ইলেকট্রিক বাস ও ভারী ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান করভার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। মন্ত্রিসভা বিস্তারিত আলোচনার পর জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে এই প্রস্তাবটি অনুমোদন করে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আমদানিকারককে অন্য সব ধরণের শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিট ১৫ শতাংশ করভার পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে আমদানিকৃত প্রতিটি যানের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা সরাসরি পরিবহন খাতের খরচ কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে।

অব্যাহতির আওতা, কারিগরি শর্ত ও শ্রেণিবিভাগ

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে এই শুল্ক সুবিধার আওতাভুক্ত যানবাহনের ধরণ ও নির্দিষ্ট শর্তসমূহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

  • নির্দিষ্ট কোড ও আসন সংখ্যা: এইচএস কোড (HS Code) ৮৭০২.৪০.০০-এর অধীনে আমদানিকৃত সর্বনিম্ন ১৭ আসনবিশিষ্ট ইলেকট্রিক বাসের ক্ষেত্রে এই শুল্ক ছাড় প্রযোজ্য হবে। ১৭ আসনের কম বা অন্য কোডের যানবাহনের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কার্যকর হবে না।

  • যানের অবস্থা ও মানদণ্ড: এই সুবিধা শুধুমাত্র সম্পূর্ণ নতুন বা ‘ব্র্যান্ড নিউ’ ইলেকট্রিক বাসের জন্য প্রযোজ্য। রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো কোনো ইলেকট্রিক বাস আমদানির ক্ষেত্রে এই বিশেষ শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা পাওয়া যাবে না। এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে দেশে উন্নত প্রযুক্তির নতুন যানবাহন প্রবেশ করে।

  • প্রযোজ্য ভ্যাট ও ব্যতিক্রম: শিক্ষার্থী পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত বাস ব্যতীত অন্যান্য সকল বাণিজ্যিক বা সাধারণ পরিবহনের উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত ইলেকট্রিক বাসের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল থাকবে। অর্থাৎ, মোট করভার ১৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

  • অব্যাহতিপ্রাপ্ত শুল্কের তালিকা: আমদানির ক্ষেত্রে সাধারণত যেসব ভারী শুল্ক আরোপিত হয়—যেমন কাস্টমস ডিউটি (CD), রেগুলেটরি ডিউটি (RD), সম্পূরক শুল্ক (SD), আগাম কর (AT) এবং অগ্রিম আয়কর (AIT)—তা ইলেকট্রিক বাস আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।

ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা

ইলেকট্রিক বাসের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ টন বা তার বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রিক ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা হবে। বাসের ন্যায় ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রেখে অন্যান্য সকল শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। এই পদক্ষেপের ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরোক্ষভাবে নিত্যপণ্যের বাজারমূল্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সময়সীমা ও প্রশাসনিক বাস্তবায়ন

সরকার ঘোষিত এই বিশেষ শুল্ক সুবিধাটি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই শুল্ক-কর অব্যাহতি সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণপত্র (LC) খোলা এবং আমদানিকৃত চালানের ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংক্রান্ত একটি বিধিবদ্ধ সংবিধিবদ্ধ আদেশ (এসআরও) জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও গুরুত্ব

বর্তমানে বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডিজেলচালিত, যা কার্বন নিঃসরণ এবং বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। ইলেকট্রিক বাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরগুলোতে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পাবে। শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি খাতের বড় বড় পরিবহন কোম্পানিগুলো ইলেকট্রিক যানের দিকে আগ্রহী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিডি, আরডি ও সম্পূরক শুল্ক মওকুফ করায় একটি ইলেকট্রিক বাসের আমদানি ব্যয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এটি পরিবহন মালিকদের জন্য একটি বড় আর্থিক স্বস্তি। একইসাথে ৫ টন বা তার বেশি ধারণক্ষমতার ট্রাকের ক্ষেত্রে এই সুবিধা পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে (Supply Chain) আরও গতিশীল করবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মনে করছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশে পরিবেশবান্ধব ‘স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন’ ব্যবস্থার পথ সুগম হবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ডে এগিয়ে যাবে।

শীঘ্রই অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে বিস্তারিত নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে এবং আমদানিকারকদের জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন জনসমক্ষে প্রচার করা হবে।