চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় (ফেক আইডি) ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ বার্তা প্রেরণ, ছবি বিকৃত করার হুমকি এবং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আজ রবিবার (৩ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযুক্ত শামীম উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগেরই একজন সিনিয়র শিক্ষার্থী।
Table of Contents
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ ও ঘটনার সূত্রপাত
অভিযোগকারী শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত। প্রক্টর বরাবর জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন গত কয়েক বছর ধরে তাকে লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন ধরনের সাইবার হয়রানি চালিয়ে আসছেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং তার চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে অত্যন্ত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী তার অভিযোগে আরও জানান, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে তিনি ইতিপূর্বে স্থানীয় হাটহাজারী থানায় উপস্থিত হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার পর কিছুদিন কার্যক্রম শিথিল থাকলেও সম্প্রতি তা পুনরায় শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ মে একটি অজ্ঞাত ও ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে তার ইনবক্সে অত্যন্ত আপত্তিকর ও হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয়। ভুক্তভোগীর দাবি, পূর্বের আচরণের ধারাবাহিকতা এবং ব্যবহৃত ভাষার ধরন বিশ্লেষণ করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই নতুন ফেক আইডিটির নেপথ্যেও শামীম উদ্দিনেরই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান ও তদন্ত প্রক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। সহকারী প্রক্টর ড. মো. কামরুল হোসেন লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার বুলিং ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিধির আলোকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা অভিযোগটি পেয়েছি। এখন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বক্তব্য শোনা হবে এবং অভিযোগকারী যে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ পেশ করেছেন সেগুলো কারিগরিভাবে যাচাই করা হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি বা চরিত্র হননের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কার করার বিধান রয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ক্যাম্পাসে নারীবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে তারা কোনো আপস করবে না।
অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন
নিজের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযোগটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং এর কোনো বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি নেই। শামীম উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, “আমি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নই। এটি আমাকে রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করার একটি পরিকল্পিত চক্রান্ত। যেহেতু আমি ছাত্রদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি, তাই আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতেই এই মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”
নিরাপত্তা ও মানসিক সংকটে ভুক্তভোগী ও পরিবার
অভিযোগপত্রে শিক্ষার্থী উল্লেখ করেছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই হয়রানির কারণে তিনি চরম মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছেন। তার একাডেমিক মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্যাম্পাসে চলাফেরার ক্ষেত্রে তিনি নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন। বারবার নতুন নতুন ফেক আইডি থেকে হুমকি আসায় তার পরিবারও অত্যন্ত উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “এই ঘটনাগুলো আমার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং আমি সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় আছি।”
সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর সাইবার অপরাধের অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবে এই তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়, তবে ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর এবং স্থানীয় থানা পুলিশের সমন্বিত নজরদারিতে রয়েছে। হাটহাজারী থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগকারীর দায়ের করা পূর্ববর্তী জিডির সূত্র ধরে নতুন করে আসা হুমকির উৎস চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে উভয় পক্ষ জানিয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ আইনি ও মানসিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
